
ভয়ভীতি কিংবা চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হবে না বলে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দলীয় নেতারা যেমন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, তেমনি জামায়াতও সেই আদর্শ থেকেই জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর আইডিবির কাউন্সিল হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদেরকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আপনাদেরকেও (শহীদ ও আহত পরিবার) দেখানো হচ্ছে। আল্লাহর কসম, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করি না। কেন ভয় করব? আমাদের নেতৃবৃন্দ ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছেন, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। আমরা সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা মনে করি, প্রতি মুহূর্তে ফাঁসির মঞ্চের ওপরই আছি।”
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের মানুষ মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করলেও দেশকে আবারও অতীতের অন্ধকার পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, আগের সরকারের সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গেস্টরুম ও গণরুমের নামে নির্যাতনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, এমনকি মেয়েদের আবাসিক হলও এর বাইরে ছিল না। এখন আবারও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের ভবিষ্যৎ অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কী করবে? জামায়াতে ইসলামী কি সেই অন্ধকার গলিপথে হাঁটবে? ইনশাআল্লাহ, না। আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি, এই জুলাই বিপ্লব হওয়ার পর থেকে যতগুলো কথা বলেছি, আল্লাহ আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখলে তার সবটুকু আমরা পালন করব। আমাদের হাতে সবকিছু নেই। আমরা সরকারে যাইনি, কোনো আফসোস নেই। কিন্তু আমরা সংসদে তো আছি। সংসদে দেশবাসীর হয়ে, শহীদদের কণ্ঠ হয়ে আমরা চিৎকার করতে থাকব ইনশাআল্লাহ।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদেরকে আপসের অনেক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনেক লোভ-টোপ বিভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে। আমরা এ পর্যন্ত এগুলো ঘৃণা করে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বলেছি, গণভোট আপনারা চাইলেন, আমরা চাইলাম। এখন আপনারা মানেন না। কিন্তু আমরা আমাদের জায়গায় আছি। আমরা এখান থেকে সরতে পারব না। জনগণের সঙ্গে আমরা বেইমানি করতে পারব না, করবও না। আপনারা দোয়া করবেন, আমাদের ওয়াদার ওপর আমরা যেন টিকে থাকতে পারি।”
গণভোটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ আমরা আশাবাদী, গণভোটের গণরায় এই বাংলার জমিনে বাস্তবায়ন হবে।”
বিচারের দাবি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, “আমরা প্রতিশোধ চাই না। কিন্তু বিচারটা কি পাব না? শুধু কারো বাবার বিচার, নিজের বিচার, মায়ের বিচার, বোনের বিচার, ভাইয়ের বিচার হবে, আর এই দেশের নিরীহ জনগণ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের হত্যাকারীদের বিচার হবে না? সেই বিচারও ইনশাআল্লাহ এই বাংলার মাটিতে হবে। কোনো কোনো বিচার এই দেশে ৫০ বছর পরে হয়েছে, কোনটা ২১ বছর পরে হয়েছে। আমরা কথা দিচ্ছি, এই বিচারও ইনশাআল্লাহ হবে। যেদিন, যে মাস, যে বছরই হোক, হবে ইনশাআল্লাহ।”
তিনি বলেন, “বিচারের দাবি আমরা ছেড়ে দেব না। আমরা ছেড়ে দেওয়ার কেউ নই। আমরা ওয়াদাবদ্ধ। এই ওয়াদা বাস্তবায়ন করব। আমরা সরকারের কাছে খোলামনে আহ্বান জানাব, ভুল মানুষের হয়, দলের হয়, সরকারের হয়, বিরোধী দলের হয়, সবারই হতে পারে। আমরা মনে করি, সুস্পষ্টভাবে আপনারা জাতির সঙ্গে দেওয়া কথা লঙ্ঘন করেছেন। জাতির সঙ্গে বিশ্বাস রক্ষা করেননি, বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আপনারা ফিরে আসেন, এই দাবি মেনে নেন। ডান-বাম করা বাদ দিয়ে সোজা চলেন। জাতি কঠিন সংকটে। আপনাদের পাশে থেকে এই দেশকে গড়বে ইনশাআল্লাহ। কারণ আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি।”
আল্লাহর ওপর ভরসা ও জনগণের শক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সমস্ত শক্তি ও কুদরত আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। অহংকার করে কেউ যেন পথে না পড়ে। আল্লাহ বিশাল বাহিনীর ওপর ক্ষুদ্র বাহিনীকে বিজয় দিয়েছেন, ইতিহাসে বারবার দিয়েছেন। সেই বিজয় আমরা দেখেছি। আমাদের সন্তানরা হাতে কোনো অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামেনি। ঈমানের অস্ত্র বুকে ধারণ করে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা খালি হাতে মোকাবিলা করেছে। সমস্ত অস্ত্র, গুলি, বারুদ সেদিন ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। এটি বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই দেশের মানুষকে, যুবসমাজকে ভয় দেখাবেন না। জুলাই যোদ্ধাদের ওপর বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ হচ্ছে। আমাদের ওপরও আক্রমণ হচ্ছে। আমাদের দোষ একটাই, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছি।”
তিনি আরও বলেন, “আক্রমণ করেন, অসুবিধা নেই। করতে করতে কে কোথায় গিয়ে পালায় আর ডুবে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। কিন্তু জাতির অধিকারের জন্য আমরা যা বলার, বলে যাব। আমাদের মুখ কেউ বন্ধ করতে পারবে না।”
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, “বীরদের আকাঙ্ক্ষা পদদলিত হলে এই জাতি গোলামের জাতিতে পরিণত হবে। আমরা গোলাম হয়ে একদিনও বাঁচতে চাই না। গোলাম হয়ে এক বছর, এক যুগও বাঁচতে চাই না। বরং আমরা বীর হয়ে এক সেকেন্ড বাঁচতে চাই।”
মতবিনিময় সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত যোদ্ধাদের পরিবার এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।