
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ আবারও পুরোনো অন্ধকার সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে এখন দেশে দলীয়করণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীতে ঢাকা মহানগর জামায়াত আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে সরকারি, বেসরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, করপোরেশন, প্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যোগ্য ও দেশপ্রেমিকদের বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, প্রশাসন, ব্যাংক-বীমা, করপোরেশন— সব জায়গায় এখন নির্লজ্জ দলীয়করণ চলছে। এটি কি নতুন ধরনের কোটা নয়? যোগ্য ও সৎ মানুষদের সরিয়ে অসৎ ও দুর্নীতিবাজদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হচ্ছে। যেন একটি দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য কায়েম করা যায়।
জামায়াতের আমির প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তারা কি শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে সরিয়ে অন্য একটি দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন? তাদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দেশ আবারও আগের অন্ধকার পথেই ফিরে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যখন অনেক রাজনৈতিক দল এটিকে শুধুই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখেছিল, তখন জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলনরত তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিল। তবে আন্দোলন সফল হওয়ার পর দলটি কখনও এর কৃতিত্ব দাবি করেনি।
তিনি বলেন, আমরা বলিনি আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড (মূল পরিকল্পনাকারী) আমরা। কিংবা আমাদের এত শহীদ হয়েছে বলে কোনো কৃতিত্ব দাবি করিনি। আমরা নির্বাচনও দাবি করিনি। বরং শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, গত ৬ আগস্টের পর থেকেই দেশে চাঁদাবাজি শুরু হলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শহীদ পরিবারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অনেক পরিবার আর্থিক সহায়তার চেয়ে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি জানান, এক শহীদের বাবা তাদের দেওয়া আর্থিক সহায়তা ফিরিয়ে দিয়ে সেটি আরও অসচ্ছল শহীদ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তার মতে, এমন মানসিকতা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের জন্য শিক্ষণীয়।
তিনি আরও বলেন, যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষ। সরকারি চাকরির কোটা পাওয়ার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ তাদের ছিল না; তারা রাস্তায় নেমেছিলেন ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায়।
বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা বিচার চাই, প্রতিশোধ চাই না। শহীদদের হত্যার বিচার একদিন না একদিন অবশ্যই এই বাংলার মাটিতে হবে। যত বছরই লাগুক, এ বিচার হবেই। এই দাবি থেকে আমরা কখনো সরে আসব না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণভোট ও জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী অনড় থাকবে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার জাতির সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি এবং এখনও সময় আছে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সঠিক পথে ফিরে আসার।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আমরা কাউকে ভয় করি না। আপসের অনেক প্রস্তাব ও নানা ধরনের লোভ দেখানো হয়েছে, আমরা সবই প্রত্যাখ্যান করেছি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না।
সবশেষে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে জীবন দিয়েও জুলাইয়ের চেতনা রক্ষা করা হবে এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে থাকার অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানের শেষে তিনি শহীদদের রূহের মাগফিরাত, আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং তাদের পরিবারের জন্য ধৈর্য ও শক্তি কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া চান।