
দিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইউনূসকে বারবার ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে তিনি সরব হন।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে নির্বাসিত জীবনে কোনো অনুষ্ঠানে এটিই শেখ হাসিনার প্রথম বক্তব্য। শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ‘সেইভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও তার পাঠানো অডিও বার্তা প্রচার করা হয়। সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাবেক একাধিক মন্ত্রী ও নেতাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারকে ‘অবৈধ ও সহিংস’ শাসনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনের এক যুগে’ প্রবেশ করেছে।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাঁদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।” দেশের পরিস্থিতিকে তিনি আখ্যা দেন ‘এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যুপুরী’ হিসেবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, “উগ্রপন্থি শক্তি ও বিদেশি শক্তি দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।”
শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে ‘পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে’ ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তার ভাষায়, সেই দিন থেকেই “দেশ ভয়াবহ সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে।” মানবাধিকার “ধুলায় পদদলিত” হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘ধ্বংস’ করা হয়েছে এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘নির্বিঘ্নে সহিংসতা চলতে দেওয়া হচ্ছে’—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি’ চলছে। তার কথায়, “জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা নেই। আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।”
তবে বক্তব্যে সবচেয়ে কড়া আক্রমণ ছিল ব্যক্তিগতভাবে মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। শেখ হাসিনার অভিযোগ, ইউনূস দেশকে “নিঃস্ব” করে দিচ্ছেন এবং ভূখণ্ড ও সম্পদ “বিদেশি স্বার্থের কাছে বেচে” দিয়ে বাংলাদেশকে “বহুজাতিক সংঘাতের অগ্নিকুণ্ডের দিকে” ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
ইউনূসের সমালোচনার পাশাপাশি তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে’ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, “শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
আওয়ামী লীগকে দেশের ‘গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের একমাত্র বৈধ ধারক’ দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, তার দলই “স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল”, যা “জনগণকে সঙ্গে নিয়ে” ছিনিয়ে নেওয়া সমৃদ্ধ স্বদেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।
অডিও বার্তায় তিনি দেশকে “সারিয়ে তুলতে” পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—ইউনূস সরকারকে সরিয়ে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ এবং ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির’ দাবি। দ্বিতীয় দফায় ‘সহিংসতা ও নৈরাজ্যের’ অবসান চেয়ে তিনি বলেন, স্থিতিশীলতাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নাগরিক সেবার পূর্বশর্ত।
তৃতীয় দফায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে তাদের ওপর ‘হামলা’ বন্ধের আহ্বান জানান। চতুর্থ দফায় ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও বিরোধীদের ‘হয়রানি ও গ্রেপ্তার’ বন্ধের কথা বলেন। পঞ্চম ও শেষ দফায় গত এক বছরের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে ‘নিরপেক্ষ তদন্ত’ দাবি করে তিনি বলেন, “সত্যের পরিশুদ্ধি” ছাড়া জাতির পুনর্মিলন সম্ভব নয়।
“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাশে আছে” উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কণ্ঠ শুনতে ব্যর্থ হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরাও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।”
এনডিটিভির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বক্তৃতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান ‘গভীর বিভাজন’ই স্পষ্ট করেছে। শেখ হাসিনা বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বনাম চরমপন্থা, বিশৃঙ্খলা ও বিদেশি প্রভাবের’ মধ্যকার লড়াই হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘দখল’ ও ‘প্রতিরোধ’-এর মতো শব্দচয়ন করে তিনি সমর্থকদের উজ্জীবিত করার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের চলমান সংগ্রামকে দলীয় নয়, বরং ‘দেশপ্রেমিক দায়িত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।