
জাপান সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে শিল্পায়ন, জ্বালানি, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের এই পরিকল্পনাকে আরও এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন দুই দেশের সরকারপ্রধান।
দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রকাশিত ঘোষণায় জানিয়েছে, ‘অভিন্ন সমৃদ্ধি’ অর্জনের লক্ষ্যে বিগ-বি উদ্যোগকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করতে চান তারা। এ পরিকল্পনার আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ ও জাপান।
সাম্প্রতিক এই অঙ্গীকারের ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিগ-বি উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে এ পরিকল্পনায় ভারতকে যুক্ত করার বিষয়ে জাপানের আগ্রহ নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে। ফলে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এই উদ্যোগের প্রকৃত লক্ষ্য, আঞ্চলিক বাণিজ্যে এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিগ-বি কী এবং কেন মাতারবাড়ীকে ঘিরে এই পরিকল্পনা
বিগ-বি হলো ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ’ বা বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি উদ্যোগ। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, বন্দর সুবিধা, জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবহনব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
বিশেষ করে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি বড় শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে চায় জাপান। শুধু বন্দর নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয় দেশটির পরিকল্পনা; পণ্য পরিবহন সহজ করা, সড়ক যোগাযোগ বাড়ানো এবং শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ লক্ষ্য নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে জাপান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে টোকিও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপান স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, বিগ-বি পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী মাতারবাড়ীকে ঘিরে একটি বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র গড়ে তোলাই জাপানের মূল লক্ষ্য।
অর্থাৎ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনাই বিগ-বির ভিত্তি।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
বিগ-বিকে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি মনে করেন, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বড় শক্তিগুলোর প্রভাব সীমিত রেখে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করতে চায় জাপান। সে কারণে শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও বিগ-বির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মাতারবাড়ীকে ঘিরে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে, যার পরিকল্পনা ও বিনিয়োগে জাপানের ভূমিকা রয়েছে। এই অঞ্চলকে শিল্প ও জ্বালানির বড় কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হলে তা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে বলে মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।
তবে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের মতো বিষয়ে সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কোন ধরনের শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য কার্যকর হবে এবং কী ধরনের জ্বালানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে উপযোগী, তা বিবেচনায় রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের ছাড়াও যেসব দেশকে অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা ছিল
বিগ-বি উদ্যোগের প্রাথমিক ধারণায় শুধু বাংলাদেশ নয়, আশপাশের কয়েকটি দেশের সম্ভাব্য বাজারকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক বাজার গড়ে তোলার চিন্তা ছিল জাপানের।
এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, পণ্য পরিবহনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিল্প উৎপাদনের জন্য একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য থেকেই পরিকল্পনাটি সামনে আসে।
২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রথম বিগ-বি ধারণাটি সামনে আনেন। পরে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর ২০২৩ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে শিল্পায়নের এই পরিকল্পনা আবারও আলোচনায় আসে। এ পর্যায়ে আঞ্চলিক বাজার সম্প্রসারণ এবং ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বিগ-বি'তে ভারতের সংযুক্তি বিষয়ে জাপানের অবস্থান
বিগ-বির আওতায় ভারতকে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উদ্যোগটির মূল পরিকল্পনা জাপানের পক্ষ থেকেই এসেছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক ও বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে দেশটির, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, এই পরিকল্পনার সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি মূলত বৃহত্তর বাজারের সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের বন্দর ও শিল্প অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারলে উদ্যোগটির অর্থনৈতিক পরিসর আরও বড় হতে পারে।
তবে ভারতের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এলেও বিগ-বির কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এবং মাতারবাড়ীকে ঘিরে গড়ে ওঠার কথা থাকা অর্থনৈতিক অঞ্চল।
যে তিন ভিত্তির ওপর বিগ-বি
শিনজো আবে বিগ-বি ধারণাটি সামনে আনার পর ২০১৪ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা।
তাঁর ব্যাখ্যায়, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশকে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের প্রধান ভিত্তি। এর পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণকে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই কাঠামো অনুযায়ী, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরকে ঘিরে শিল্পকারখানা স্থাপন ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসরও বাড়বে। একই সঙ্গে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ, বন্দর, জ্বালানি ও পরিবহন—এই তিন খাতের উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই মাতারবাড়ীকে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় জাপান।
মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণে জাপানের ভূমিকা
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাপান, চীন ও ভারত আগ্রহ দেখিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ এ প্রকল্প নিয়ে জাপানের সঙ্গে চুক্তি সই করে।
বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করছে জাইকা। বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী বন্দরকে জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করতে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণে সহায়তা দিচ্ছে সংস্থাটি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে চকরিয়া পর্যন্ত বিদ্যমান মহাসড়ক উন্নয়নেও জাইকার সহায়তা রয়েছে।
এই যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে মাতারবাড়ী বন্দরে পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হবে এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার সংযোগ বাড়বে। ফলে গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প, জ্বালানি ও বাণিজ্যের যে বৃহত্তর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির পথও সুগম হতে পারে।
সাম্প্রতিক যৌথ ঘোষণায় বিগ-বিকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্মতি তাই শুধু একটি বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শিল্পায়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরির লক্ষ্য। তবে এই উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশ কতটা সুফল পাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের ধরন এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে তার ওপর।
সূত্র: বিবিসি