
বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শক্তিশালী বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দিতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খাতগুলো হলো- অটোমোটিভ উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।
টোকিওর জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম ডায়ালগে’ প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে এসব খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা ও ব্যবসার সুযোগ খুঁজে দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশটিতে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এখনো ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে। গত অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ২ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে উন্নয়ন সহায়তার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিস্তৃত অংশীদারত্বে উন্নীত করতে হবে।
দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর অন্যতম জাপান। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। এ সময় তিনি তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে তাঁদের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এ বছর স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাংলাদেশের জন্য কোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের প্রথম চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে স্টিল, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাজার, গড়ে ২৭ বছর বয়সী তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটিতে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অটোমোটিভ খাতকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনে টয়োটার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানান। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
জ্বালানি খাতে এলএনজি অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাপানের জেরা করপোরেশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ।
প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে গুরুত্ব দিয়ে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে ‘বাংলাদেশ-জাপান টেকনোলজি পার্ক’ এবং উদ্ভাবনভিত্তিক আইটি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মহাকাশ সক্ষমতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
রেল ও লজিস্টিকস খাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে আধুনিক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জাপানি বিনিয়োগকে স্বাগত জানান তিনি।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের শস্য, ফল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। জাপানি কোম্পানিগুলো আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ করতে পারে। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মান অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি উন্নয়ন করছে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো এবং সহজ কাস্টমস ও করব্যবস্থা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং সমাধানে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ব্যবসায়িক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সরকারের দায়িত্ব।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান। বাংলাদেশি তরুণদের কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষায় পারদর্শী করে তুলতে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে উভয় দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে দক্ষ পেশাজীবীরা ভূমিকা রাখতে পারবেন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ যখন তার ভিত্তি নির্মাণ করছিল, তখন জাপান পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্প গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং যৌথভাবে সমৃদ্ধি অর্জনে জাপানের অংশীদারত্ব চায় সরকার।
জেট্রো, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (জেবিসিসিইসি) এবং জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ সহযোগিতায় এ ফোরামের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে জেট্রোর সভাপতি সুসুমু কাতাওকা সূচনা বক্তব্য দেন। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি ভাইস মিনিস্টার শিনজি ওয়াকায়ামা অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গঠনের বিষয়ে বক্তব্য দেন। ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বিনিয়োগ সহজীকরণে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরেন। মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানির ঢাকা শাখার জেনারেল ম্যানেজার কেনইচিরো কাওয়ামোতো, ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।