
দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে বলে দাবি করা হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল ও বস্তির অনেক মানুষ এখনো এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আবার দরিদ্র অনেক পরিবারকে ভাগাভাগি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। তাই শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করে কারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছেন, তা নির্ধারণ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ক্যাব যুব সংসদ আয়োজিত গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাব্যতা যাচাই ও লাইফলাইন গ্রাহক সমীক্ষা: ফলাফল ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এ গণসংলাপে গবেষণার ফলাফল ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
রিজভী বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরূপণ নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। গবেষণার মূল প্রবন্ধ পড়ে তাঁর কাছে বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠ মনে হয়েছে। প্রচলিত পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না ধরে, এর ভিত্তি ও যথার্থতা যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্রা বিবেচনা করে কাউকে হতদরিদ্র বা চরম দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা যথাযথ, তা যাচাই করা প্রয়োজন। গবেষণায় বিকল্প ব্যাখ্যা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন করার গুরুত্ব তুলে ধরে রিজভী বলেন, শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশ্ন করা। প্রশ্নের মধ্য দিয়েই জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা এগিয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রশ্নের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের হাত ধরে আরও বিকশিত হয়েছে।
আলোচ্য গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের মধ্যে কারা প্রকৃত অর্থে চরম দরিদ্র, তা নির্ধারণে তাঁদের বাস্তব জীবনযাত্রা বিবেচনা করা দরকার।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রিজভী বলেন, কুড়িগ্রামের ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছালেও সেখানকার সব পরিবার সমানভাবে সুবিধা পায় না। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পেলেও অনেক দরিদ্র পরিবার তা থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে।
ঢাকার বস্তি এলাকার বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক দরিদ্র মা-বাবা কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের সদস্যদের পালা করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। একজনের পড়াশোনা শেষ হলে অন্যজন পড়তে বসে। কখনো হারিকেন জ্বালিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হয়।
রিজভীর মতে, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে দারিদ্র্যের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের গবেষণায় মানুষের জীবনযাত্রা, বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ এবং ভাগাভাগি করে ব্যবহারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তিনি গবেষণাটির উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বাড়ছে। এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকেও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রিজভী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পরিবার ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এ খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে সমস্যার কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ফলে দেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা গেলে জ্বালানি খাতে আরও সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। তবে সরকারের বৈধতা, দেশপ্রেম ও অঙ্গীকার রক্ষার তাগিদ থাকলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গণসংলাপে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। এ সময় ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম এবং গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।