
বাংলাদেশ ও কানাডার সম্পর্ক এখন আর কেবল উন্নয়ন সহযোগিতা বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
অজিত সিং বলেন, কানাডা বাংলাদেশকে শুধু বাণিজ্যের একটি গন্তব্য হিসেবে দেখছে না। বরং একটি উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ-কানাডা সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকের স্বীকৃতিদাতা দেশগুলোর মধ্যে কানাডা অন্যতম। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে সহযোগিতা করতে পেরে কানাডা গর্বিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রসঙ্গে কানাডার হাইকমিশনার বলেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দুই দেশের বাণিজ্য ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি গত মাসে কানাডিয়ান পটাশ সার সরবরাহে সরকার-টু-সরকার নতুন একটি চুক্তি ঘোষণার কথাও জানান তিনি।
অজিত সিং বলেন, ২০১৪ সাল থেকে এই ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনের বেশি কানাডিয়ান পটাশ সরবরাহ করা হয়েছে।
তার মতে, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, জলবায়ু প্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগ—এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
কানাডার হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে প্রাথমিক পর্যায়ের সাহায্যনির্ভর কাঠামো থেকে বের করে এমন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে নেওয়া প্রয়োজন, যেখানে উভয় দেশ নিজেদের পরিপূরক সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের জন্য আরও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব হবে।
ভূরাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা দেশগুলোর প্রসঙ্গে অজিত সিং বলেন, এসব দেশকে সার্বভৌমত্ব ও উন্মুক্ততার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে—এমন নয়। একইভাবে জাতীয় স্বার্থ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি বাদ দিয়ে অন্যটি বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, বহুমেরুবিশ্ব মানেই যে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা অনিবার্য, তা নয়। বরং সেখানে সহযোগিতা ও নতুন সম্ভাবনার জায়গাও রয়েছে।
অজিত সিং বলেন, নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগ্রহী দেশগুলোর মধ্যে পরস্পরনির্ভর ও পরিপক্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব। কোনো জোট সংকটপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে, কোনোটি খাদ্যনিরাপত্তা, আবার কোনোটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য কিংবা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কাজ করতে পারে।
সব নেটওয়ার্কে একই দেশগুলোর সদস্য হওয়া জরুরি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী হতে হবে, যাতে নাগরিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ফলাফল নিশ্চিত করা যায়।
বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা প্রসঙ্গে কানাডার হাইকমিশনার বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে কানাডা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু একটি দেশের আকার কিংবা সামরিক শক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত বিশ্বব্যবস্থা সাধারণ দেশগুলোর স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারে না। বাংলাদেশ, কানাডা এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর স্বার্থ অনেকাংশেই কার্যকর ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
অজিত সিং বলেন, এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্ব থাকবে এবং দেশগুলো নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন না দিয়েও পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারবে। এ ধরনের ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে প্রচলিত বৃহৎ শক্তিগুলোর বাইরেও কানাডা ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।