
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের সময় মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে জামায়াতে ইসলামীর নাম বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছিল বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সংসদে আইনটি পাসের সময় জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য ‘না’ ভোট দেননি। তাঁর দাবি, ‘না’ ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি ১৯৭১ সালের ভূমিকা মেনে নিয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর লেকশোর গ্র্যান্ডে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : এর ইতিহাস ও রাজনীতি’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, গবেষক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ২০১৬ সালে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য দলটিকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ওই অবস্থান জামায়াত তখন গ্রহণ করলে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত।
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ের প্রশংসা করে আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি লেখকের ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চিন্তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তবে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার মধ্যে একটি মূল্যবোধের জায়গা রয়েছে।
তিনি বলেন, বইটিকে তাঁর কাছে সাহিত্য বা গবেষণাগ্রন্থের চেয়ে একজন জীবন্ত মানুষের ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ মনে হয়েছে। একজন মানুষ তাঁর জীবন দিয়ে একটি সমাজকে যেভাবে দেখেছেন এবং তাঁর জীবনদর্শন যেভাবে গড়ে উঠেছে, বইটি তারই প্রতিফলন।
জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব ও দলটির আইনজীবীদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার বিষয়েও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বইটির সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও আলোচনায় অংশ নিয়ে সেই মত প্রকাশ করা যেত। তাঁর ভাষায়, ‘দিস ইজ ডেমোক্রেসি’। কোনো লেখকের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া যেমন জরুরি নয়, তেমনি তাঁর সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারাও সঠিক নয়।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের আইনে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এবং পরে ২০২৬ সালে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে এতে সংশোধন আনা হয়।
তিনি বলেন, সংশোধনী নিয়ে আলোচনার সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংজ্ঞা থেকে দলটির নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। তবে সরকার ঐতিহাসিক বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেনি। পরে সংজ্ঞায় ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’ ও ‘তৎকালীন নেজামে ইসলাম’ শব্দগুলো রাখা হয়। ২০২৬ সালের আইনের সরকারি পাঠেও এই উল্লেখ রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংসদে বিলটি পাসের সময় ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের সুযোগ থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য ‘না’ ভোট দেননি। তাঁর ভাষ্য, ‘না’ ভোট না দেওয়ার মাধ্যমে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে জামায়াত ১৯৭১ সালের ভূমিকার বিষয়টি পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন ও নীতির ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটির মধ্যেই তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়।
সরকারি আইনের পাঠ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগী হিসেবে ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম’সহ কয়েকটি পক্ষের বিরুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।