
সাইবার সুরক্ষা আইন ব্যবহার করে গণমাধ্যম কিংবা কোনো ব্যক্তির কণ্ঠ রোধ বা নিপীড়নের সুযোগ রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান। তিনি বলেছেন, একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জননৈতিকতা ক্ষুণ্নকারী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান তিনি।
আন্দালিভ রহমান বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়ন ও তা নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। কোনো কোনো শব্দ বা ধারার একাধিক অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ভবিষ্যতে ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে যাতে আইনটির অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ১৭ থেকে ২০ বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন সংবাদমাধ্যম বা সংবাদপত্রকে চাপে রাখা কিংবা ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহারের ঘটনা দেখা গেছে। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন যাতে পরবর্তীতে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হয়, সেটিই তারা নিশ্চিত করতে চান।
মন্ত্রী জানান, সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়েও তাদের মতামত নেওয়া হবে। কোনো শব্দ বা ধারার ব্যাখ্যার কারণে গণমাধ্যম কিংবা অন্য কারও ওপর নিপীড়ন বা আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না হওয়াই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জননৈতিকতা নষ্ট করে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করাও আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে গালিগালাজ ও অশালীন ভাষার ব্যবহার বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
আন্দালিভ রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জননৈতিকতা ক্ষুণ্নকারী বিষয়গুলোকে কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায় এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি কীভাবে সম্মান দেখানো যায়—দুইয়ের মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত তৈরি না হয়, সেটিই বারবার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কোনোভাবেই এই আইন কারও কণ্ঠ রোধ বা নিপীড়নের জন্য তৈরি করা হচ্ছে না।’ অতীতে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই আইনটির খসড়া তৈরি ও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
আইনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কনটেন্ট দেখলেই যাচাই-বাছাই ছাড়া শেয়ার করা, মানহানিকর বক্তব্য প্রচার বা পুনঃপ্রচার করার মতো বিষয়েও মানুষকে সচেতন করতে হবে।
তিনি জানান, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও একটি কর্মসূচি নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
মন্ত্রী বলেন, আইনটি এমনভাবে প্রণয়ন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এর অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে মানুষের সম্মানহানি বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও যেন তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
এদিকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সকাল ১০টায় কমিটির বৈঠক শুরু হয়। এতে পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছাড়াও সাংবাদিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো গুরুতর বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মূলত সাইবার সুরক্ষা আইন কীভাবে প্রণয়ন করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে মেটা ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কনটেন্ট ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমনকি এসব কনটেন্টের প্রভাবে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘আমরা এই কনটেন্টগুলো নিয়ে খুব সিরিয়াস। যেসব কনটেন্ট সামাজিকভাবে ক্ষতি করছে, সেগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া জরুরি। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হবে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকেই আলোচনা শেষ হয়নি। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় কমিটির পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।