.webp)
প্রলয়ংকরী বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির চলমান ত্রাণ, পুনরুদ্ধার ও মানবিক কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভাণ্ডারীর কাছে এ সহায়তার কথা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এ সময় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহকে লেখা একটি চিঠিও নেপালের রাষ্ট্রদূতের কাছে হস্তান্তর করেন।
বাংলাদেশের দেওয়া ১০ লাখ মার্কিন ডলার নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছে। উত্তর নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য চলমান ত্রাণ, পুনরুদ্ধার এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যবহারের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল
গত ২৬ আগস্ট নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর প্রবাহে হঠাৎ ব্যাপক পানি নেমে আসে। এর পেছনে সীমান্তের উত্তরে লেহেন্দে খোলা এলাকায় বরফ ও পাথরের ধস এবং সাময়িকভাবে পানি আটকে যাওয়ার ঘটনা ভূমিকা রেখেছিল। পরে সেই পানি প্রবল স্রোতে নিচের দিকে নেমে এসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
দুর্যোগটি শুধু রাসুয়া নয়, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, গোরখা ও তানাহুনসহ মোট ছয়টি জেলায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সরকারি স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত দুর্যোগ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব এলাকায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও উঠে এসেছে।
৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপালে এ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২৫২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৪ হাজার ২১৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। দুর্গম পার্বত্য এলাকা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও অবকাঠামোর কারণে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু এবং বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার বাড়ি ধ্বংস অথবা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত ৭ হাজার ৫০০ বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকশ মানুষ সেখানে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আগেই সহমর্মিতা জানিয়েছিল বাংলাদেশ
নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগের পরপরই বাংলাদেশ সরকার দেশটির পাশে থাকার কথা জানায়। ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। ওই সময় তিনি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুর্যোগটিকে ‘ভয়াবহ ট্র্যাজেডি’ হিসেবে উল্লেখ করে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সংহতি জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ প্রয়োজন অনুযায়ী নেপালকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বাংলাদেশের এই সংহতি ও সহমর্মিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের পর প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনায় শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরে ১ সেপ্টেম্বর নেপাল দূতাবাসে খোলা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে তিনি নেপালের সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ করেন।
এর দুই দিন পর নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ।
ত্রাণ ও পুনরুদ্ধারে ব্যবহার হবে অর্থ
বাংলাদেশের দেওয়া এই অর্থ সরাসরি নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হয়েছে। ফলে অর্থটি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য চলমান ত্রাণ, পুনরুদ্ধার এবং মানবিক কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে।
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সড়ক ও সেতু পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা, ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো—সবকিছুতেই বড় ধরনের অর্থ ও জনবল প্রয়োজন হচ্ছে।
সাম্প্রতিক হিসাবে, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রায় ২০ হাজার বাড়ি ধ্বংস বা বসবাসের অযোগ্য হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সরানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ফলে জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনেও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে
নেপালের এই দুর্যোগে বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ভারত ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে, চীন উদ্ধার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ অর্থ ও জরুরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নেপালের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে, কারণ উদ্ধারকাজের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নিখোঁজ মানুষকে খুঁজে বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ একসঙ্গে চালাতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৯ হাজারের বেশি সেনা সদস্য উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি, হেলিকপ্টার ও বিশেষজ্ঞ দল ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ১০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা নেপালের জরুরি ত্রাণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা হিসেবে যুক্ত হলো। একই সঙ্গে দুর্যোগের শুরু থেকেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রকাশ করা সহমর্মিতা, সংসদে শোকপ্রস্তাব এবং পরবর্তী আর্থিক সহায়তার মধ্য দিয়ে নেপালের সংকটে বাংলাদেশের সংহতির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।