
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিলটি উত্থাপনের পর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। শুরুতে কমিটিকে দুই কর্মদিবসের মধ্যে বিলটি যাচাই-বাছাই করে সংসদে ফেরত দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও এ নিয়ে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তারা সময় বাড়ানোর দাবি জানান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চার কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তাব করেন। শেষ পর্যন্ত চার কর্মদিবস সময় নির্ধারণ করে সর্বসম্মতিতে বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিলের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, দক্ষ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউনিটটির ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিলের প্রথম ধারায় আইনটির নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারী পদায়ন কিংবা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠন করা হবে। এর সদর দফতর থাকবে ঢাকায়।
এসআরবির নেতৃত্বে থাকবেন একজন মহাপরিচালক। বাংলাদেশ পুলিশের কর্মরত অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন মহাপরিচালক।
যেসব দায়িত্ব থাকবে এসআরবির
বিলের ১০ ধারায় এসআরবির দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করার দায়িত্বও থাকবে ইউনিটটির।
আদালত, সরকার কিংবা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে এসআরবি।
বিলের ১২ ধারায় এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি এবং প্রচলিত অন্যান্য আইনের বিধান মেনেই প্রয়োগ করতে হবে।
১৩ ধারায় বলা হয়েছে, তল্লাশি, আটক, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার যে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যাবলি রয়েছে, তা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের নিচে নন—এমন এসআরবি কর্মকর্তারা প্রয়োগ করতে পারবেন।
তবে কাউকে গ্রেপ্তার বা কোনো আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবির হেফাজতে রাখা যাবে না। বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে বা জব্দ করা আলামত অনতিবিলম্বে নিকটস্থ থানার হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে।
আদালত, সরকার অথবা পুলিশ মহাপরিদর্শক যেকোনো সময় এসআরবি মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। এরপর মহাপরিচালক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনো সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন।
তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজন বিবেচনায় এসআরবির হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকার বিধানও রাখা হয়েছে।
সদস্যদের জন্য কঠোর শৃঙ্খলা
বিলের ১৭ ধারায় এসআরবি সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত করা বা অসদাচরণ, অনুমতি ছাড়া গার্ড, চৌকি বা পেট্রোল ত্যাগ, আটক বা গ্রেপ্তার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য করাকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম নষ্ট কিংবা হারানো, অসুস্থতার ভান করা, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে জমি দখল, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ বা এমন আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ থাকলে তাকে আটক করা যাবে। তবে আটকাদেশ দেওয়া কর্মকর্তাকে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে হবে এবং আটক সদস্যকে লিখিতভাবে আটকের কারণ জানাতে হবে।
কোনো সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন পরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে। আর অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
গুরু ও লঘুদণ্ডের বিধান
এসআরবি সদস্যদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ড—দুই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, সর্বোচ্চ এক বছরের জ্যেষ্ঠতা বা বেতন-ভাতা বাজেয়াপ্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করা।
লঘুদণ্ড হিসেবে অনূর্ধ্ব এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা, তিরস্কার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য কোয়ার্টার গার্ডে আটক, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য ব্যাটালিয়নে আটক রেখে অতিরিক্ত ড্রিল, গার্ড বা অন্যান্য দায়িত্ব এবং প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে সর্বোচ্চ ১৪ দিনের শাস্তিমূলক ড্রিলের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে এসব শাস্তি দেওয়া যাবে না।
বিভাগীয় কার্যধারায় দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আদেশ জারির তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা যাবে। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারের আদেশের বিরুদ্ধে মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে আপিল করা যাবে। আর মহাপরিচালকের আদেশের বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে আপিলের সুযোগ থাকবে। আপিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কমিটি
এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
কমিটিতে থাকবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দফতরের অন্যূন এআইজি পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি এবং ইউনিটের পরিচালক (লিগ্যাল ও মিডিয়া)।
কমিটি অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে পারবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করতে পারবে। পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যায্য আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সদস্যদের সংক্ষোভ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে কমিটির।
অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় সাক্ষী ও দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কমিটি দেওয়ানি আদালতের অনুরূপ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবে।
র্যাবের সম্পদ ও জনবল যাবে এসআরবিতে
আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব গঠন-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। তবে নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত ‘র্যাবের কোর্ট পদ্ধতি ও বিভাগীয় কার্যধারা বিধিমালা, ২০০৫’ প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ এসআরবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকবে।
একই সঙ্গে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাববহি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দলিল এসআরবির অনুকূলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর ও ন্যস্ত বা অর্পিত হবে।
কেন র্যাবের পরিবর্তে এসআরবি
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে জাতীয় ও জননিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ, চরমপন্থা, মানবপাচার এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় একটি আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ইউনিটটির ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব লক্ষ্য সামনে রেখেই র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) প্রতিষ্ঠার জন্য বিলটি আনা হয়েছে।