
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কের মুখে থাকা এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে একটি বিল উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের পর এর বিরোধিতা করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, নাম পরিবর্তনের আড়ালে মূলত র্যাবকেই নতুন কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ সময় আপত্তির জবাব দিতে গিয়ে পুলিশের সাবেক আইজিপির প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাথাব্যথা হয়েছে, মাথা কর্তন করা যায় না।’
বিলটি নিয়ে আলোচনায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম র্যাবের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আয়নাঘরের মতো ঘটনায় বাহিনীটি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে দেশের সব রাজনৈতিক দল র্যাব বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন সেই সংস্থাকেই নতুন নাম ও কাঠামোর মাধ্যমে আবার প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম র্যাবকে ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে বাহিনীটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, নতুন কোনো বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন হলে সেটি গঠনের আগে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি যদি তখন উপদেষ্টা পরিষদে প্রস্তাবটি করতেন, তাহলে খুশি হতাম; কিন্তু ১৮ মাসে একবারও সেটা মনে হয়নি।’
পুলিশের সাবেক প্রধানের বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গও টেনে আনেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘পুলিশের প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর, আমরা কি পুলিশ বিলুপ্ত করে দেব?’ সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘র্যাব’ নামের সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজন রয়েছে।
বিল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও। তিনি জানান, র্যাব বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তকে বিরোধী দল সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করে। তবে নতুন কোনো সংস্থা বা বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা এবং যথাযথ চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বানও জানান তিনি।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নে স্বচ্ছতা এবং পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইউনিটটির কোনো সদস্য শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বিলে সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।
আলোচনা শেষে বিলটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত আইনে র্যাবের বিদ্যমান জনবল থেকে শুরু করে নগদ অর্থ, ব্যাংক তহবিল, সম্পদ, দায়, বিভিন্ন চুক্তি এবং সব ধরনের রেকর্ডপত্র নতুন করে গঠিত এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে এই ইউনিটের মহাপরিচালক করার প্রস্তাবও রয়েছে।
নতুন ইউনিটকে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। প্রস্তাবিত আইনে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদকক্ষ পরিচালনার সুযোগ রাখার পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং মালামাল জব্দ করার পূর্ণ ক্ষমতাও ইউনিটটিকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে আসা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বহুপক্ষীয় একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে। নতুন আইনের বিধিমালা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক বিষয়গুলো ২০০৫ সালের বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
এদিকে র্যাব বিলুপ্ত ও এসআরবি গঠনের বিল উত্থাপনের পাশাপাশি একই দিনে জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
প্রস্তাবিত এপিবিএন আইনে বাহিনীটিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে যেকোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি চালানো, মালামাল জব্দ এবং গ্রেপ্তারের পূর্ণ আইনি ক্ষমতাও দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বিশেষ নিরাপত্তা, পার্বত্য এলাকা, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত শাখার সমন্বয়ে এপিবিএনের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে বাহিনীর সদস্যরা যাতে গণমাধ্যম বা অন্য কোনো প্রকাশ্য মাধ্যমে তথ্য ফাঁস করতে না পারেন, সে জন্য বিলে কঠোর আচরণবিধি ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।