ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবার এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বিবিসি আজ বুধবার মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ফক্স নিউজকে দেওয়া রিপাবলিকান নেতার একটি সাক্ষাৎকারের বরাতে এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে।
টানা চার দিনের সামরিক সংঘাত ও অবরুদ্ধ বন্দরসমূহ
দুই বৈরী দেশের মধ্যে টানা চার দিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী হামলা ও পাল্টা হামলার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্পের এই চরমপত্র সামনে এল। এর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সমস্ত নৌযানের ওপর ২০ শতাংশ ফি বা শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে আসেন ট্রাম্প। তবে তাঁর সরাসরি নির্দেশে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী ইরানের সবগুলো সমুদ্রবন্দরের বিরুদ্ধে পুনরায় কঠোর নৌ-অবরোধ (ব্লকেড) কার্যকর করেছে।
এই সর্বাত্মক অবরোধের অংশ হিসেবে অতিসম্প্রতি হরমুজ প্রণালীর সন্নিকটে অবস্থিত ইরানের হরমোজগান প্রদেশের কুহেস্তাক অঞ্চলের একটি বন্দরে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি হামলা চালিয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের মূল হুমকি ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার কথা অকপটে স্বীকার করে ট্রাম্প বলেন:
‘আগামী সপ্তাহটা ওদের (ইরান) খুব খারাপ যাবে। আমরা তাদের সব বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র অকেজো করে দেব। তারা যদি আলোচনার টেবিলে ফিরে দরকষাকষি না করে, তাহলে আমরা তাদের সব সেতু ধ্বংস করে দেব।’
উল্লেখ্য, এর আগেও গত এপ্রিল মাসে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও সেতুসহ বিভিন্ন বেসামরিক নাগরিক পরিষেবার ওপর বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন:
‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধের শামিল।’
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৪৯ সালের ঐতিহাসিক জেনেভা কনভেনশন—যা যুদ্ধ এবং সশস্ত্র সংঘাতের সময় মানবিক আচরণ রক্ষা করার আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে—তাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের টিকে থাকার জন্য অতিপ্রয়োজনীয় বা ‘অত্যাবশ্যক’ কোনো অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
শেষ মুহূর্তের আলটিমেটাম
মঙ্গলবার রাতে প্রচারিত ফক্স নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেইয়ার’-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গতিপথও তুলে ধরেন। তিনি বলেন:
‘আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে রেহাই দেব। তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলোর ওপরও হামলা হবে।’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানি প্রতিনিধিদের কড়া ভাষায় শেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের বার্তাটি ছিল:
‘দ্রুত চুক্তি করা আপনাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। আর না হলে আপনাদের কাছে আর কিছুই থাকবে না।’
শুল্কের বদলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ
এর আগে গত সোমবার ট্রাম্প এক নাটকীয় ঘোষণায় দাবি করেছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ হরমুজ প্রণালীর ‘অভিভাবক’। এই নৌপথকে সুরক্ষিত রাখতে সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত মালবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক বসানোর প্রস্তাব করেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে বন্দর অবরোধের আদেশ দেন এই সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী।
তবে পরবর্তীতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া একটি পোস্টে ট্রাম্প শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথা জানিয়ে লেখেন:
‘২০ শতাংশ ফি আদায় না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিবর্তে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করবে। এই বিনিয়োগগুলোর পরিমাণ অনেক বেশি হবে। তবে একই সঙ্গে এটি ওই দেশগুলোর জন্য খুবই উপকারী হবে। ভবিষ্যতেও এই উপকার অব্যাহত থাকবে’
তবে এই চুক্তি বা বিনিয়োগের পরিধি কেমন হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি খোলাসা করেননি।
তেহরানের অনড় অবস্থান ও পাল্টা জবাব
ওয়াশিংটনের এই সর্বাত্মক ব্লকেড ও সামরিক হুমকির মুখে তেহরানও তাদের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অতিগুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব তাদের হাতেই থাকবে।
মার্কিন অবরোধের কারণে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
‘ট্রাম্পের ব্লকেড আরোপের সিদ্ধান্তে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত ভেস্তে গেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের এই বলপ্রয়োগের নীতিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন:
‘যদি যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে কঠোর উদ্যোগ নিয়ে, সামরিক অভিযান চালিয়ে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমাদের আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করবে, তাহলে তারা ভুল করছে।’