
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৪ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত থাকলেও বিশ্ববাজারে তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর বেশি দামে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে সরকারের প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত শুধু জ্বালানি তেল আমদানিতেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে। বাকি লোকসান হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। এখন হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে একই ধরনের আর্থিক চাপ আবারও তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমঝোতাও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ৪ থেকে ৫টি কোম্পানি উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা কম প্রিমিয়াম বা জাহাজ ভাড়ায় তেল সরবরাহে সম্মত হয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান এলএনজি সরবরাহ করছে না। ফলে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকেই এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান রোববার বলেন, "হরমুজ বন্ধ থাকলে তেল এবং এলএনজির দাম বাড়বে। এটা বাংলাদেশের জন্য চিন্তার। গত মাসে যুদ্ধবিরতির কারণে এলএনজির দাম অনেক কমে এসেছিল। এখন বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম কী হয় সেটা দেখার বিষয়।"
তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনতে বাংলাদেশকে ২৮ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর গত সপ্তাহে একই এলএনজি ১৬ থেকে ১৭ ডলারে কেনা সম্ভব হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের লেনদেন শুরু হলে নতুন মূল্য পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। সর্বশেষ গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৭৬ দশমিক ১০ ডলার। অথচ মার্চ-এপ্রিলের যুদ্ধকালীন সময়ে তা ১১৪ ডলারেরও বেশি উঠেছিল।
জি-টু-জি চুক্তির আওতায় ১৬ লাখ টন ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল কেনার বিষয়ে গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে ১০টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বৈঠকে কেবল প্রিমিয়াম বা পরিবহন ব্যয় নিয়ে দরকষাকষি হয়। ভারতের আইওসিএল প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৯ দশমিক ৫ ডলার প্রিমিয়ামে ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়। পরে ইউনিপেক, পেট্রো চায়নাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই দরে সরবরাহে রাজি হয়। অথচ জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত উন্মুক্ত দরপত্রে সরকারকে প্রতি ব্যারেলে সাড়ে ১৩ ডলারের বেশি প্রিমিয়াম গুনতে হয়েছে।
ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথমে ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টি ১৪ ডলারের বেশি প্রিমিয়াম দাবি করেছিল। পরে আইওসিএল কম দরে রাজি হলে অন্যরাও একই প্রস্তাব দেয়। তার ভাষ্য, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এক সেন্ট কম প্রিমিয়াম মানেই প্রায় ৮২ লাখ টাকা সাশ্রয়। সেই হিসাবে ১৬ লাখ টন তেল আমদানিতে উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা কম ব্যয় হবে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, রোববার জি-টু-জি পদ্ধতিতে ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এখন এটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
সরকারি হিসাব বলছে, এই পরিমাণ তেল আমদানিতে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভর করবে। বিপিসি প্ল্যাটস সিঙ্গাপুর মূল্যসূচকের ভিত্তিতে তেল আমদানি করে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, গত চার মাসে জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ সরকার সংস্থাটিকে কোনো অর্থ দেয়নি। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২সহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার করে তেল আমদানি করতে হয়েছে। এর ফলে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় বা লোকসান হয়েছে। এ বিষয়ে বিপিসি একাধিকবার অর্থ বিভাগের কাছে ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠালেও এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রোববার পর্যন্ত বিপিসির সংরক্ষণাগারে ৪ লাখ ১৪ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা প্রায় ৩৪ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ৪০ দিনের। সংস্থাটির আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মাসে আরও ৮ থেকে ১০টি ডিজেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যুদ্ধের সময় ৩০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেলের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিল পরিশোধ করতে হলেও বর্তমানে একই পরিমাণ তেলের বিল কমে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমেছে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত মার্চের জ্বালানি সরবরাহ সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই ডিপোগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। তার মতে, বর্তমান প্রস্তুতির কারণে এবার জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম।