
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বহুল আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি’ মামলার তদন্তে এসেছে এক নাটকীয় মোড়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিবিড় তদন্তের পর অবশেষে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করে খসড়া চার্জশিট (অভিযোগপত্র) চূড়ান্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এই জালিয়াতির ঘটনার খসড়া অভিযোগপত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত করেছে। প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার এই সুবিশাল খসড়া নথিটি চূড়ান্ত আইনি মতামত ও পরামর্শের জন্য ইতিমধ্যেই অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
সিআইডি সূত্র মারফত জানা গেছে, ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর টানা ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে এই খসড়া চার্জশিট তৈরি করা হলো। এতে বাংলাদেশের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশের ১০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ভারত, চীন ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকসহ মোট ৬৪ ব্যক্তি ও সংস্থাকে দায়ী করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা খসড়াটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানোর পর এখন সেটি সেখানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সেখান থেকে আইনি সবুজ সংকেত বা পরামর্শ মিললেই আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিলসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১০১ মিলিয়ন ডলারের এই বিশাল রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও অন্যান্যদের মধ্যে যাদের নাম যুক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন— বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা। এছাড়া অভিযুক্ত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা ও ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্থানার নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদল অজ্ঞাত হ্যাকার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয়। এই লোপাট হওয়া অর্থের মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের চারটি অ্যাকাউন্টে এবং অবশিষ্ট ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে পাচার করা হয়।
তবে হ্যাকারদের টাইপিং বা বানান ভুলের কারণে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো ২০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ফিলিপাইন থেকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এই নজিরবিহীন সাইবার চুরির ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন উপ-পরিচালক (হিসাব ও বাজেটিং) জোবায়ের বিন হুদা।
বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার সিআইডির হাতে রয়েছে। এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর সিআইডি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খুব দ্রুতই এই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।