
সরকারি কেনাকাটা বা ই-জিপি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলে কাগজে-কলমে প্রভাবশালী বড় ঠিকাদারদের কাজ পাওয়া এবং পরে তা স্থানীয় পর্যায়ে বারবার হাতবদল বা 'বিক্রি' করে দেওয়ার কারণে গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো চরম নিম্নমানের হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বহিরাগতদের এমন আধিপত্য রুখতে এবং কাজের গুণগত মান ধরে রাখতে অবিলম্বে স্থানীয় পেশাদার ঠিকাদারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি তুলেছেন খোদ সরকারি দলের আইনপ্রণেতারা।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে এই সংবেদনশীল বিষয়টি উত্থাপন করেন সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা এই অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘এলজিইডির মাধ্যমে গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা উন্নয়নকাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কাজ অন্য জেলা বা বিভাগের ঠিকাদারদের দেওয়া হচ্ছে। এসব ঠিকাদার নিয়মিত কাজ তদারকি করেন না এবং স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।’
সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন মাঠপর্যায়ের কাজের করুণ দশা তুলে ধরে আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কাজগুলো একাধিকবার হাতবদল হওয়া। মূল ঠিকাদার কাজ নিয়ে পরে স্থানীয় পর্যায়ে অন্যদের কাছে ছেড়ে দেন। এতে মাঝপথে বিপুল অর্থ চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত কম বাজেটে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কাজ শেষ করা হয়। ফলে কাজের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় পেশাদার ঠিকাদারদের সুযোগ দেওয়া হলে তারা এলাকার প্রয়োজন সম্পর্কে বেশি অবগত থাকেন এবং জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহির কারণে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেন।’
সাংসদদের এমন যৌক্তিক উদ্বেগ ও দাবির মুখে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিদ্যমান ক্রয়বিধি (পিপিআর) পর্যালোচনা করে স্থানীয় যোগ্য ঠিকাদারদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’
বিতর্কের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদকে জানান, এলজিইডির সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ মূলত সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) মেনেই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্রের (এলটিএম) ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলার নিবন্ধিত ঠিকাদাররাই অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তবে উন্মুক্ত দরপত্রের (ওটিএম) নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে দেশের যেকোনো প্রান্তের ঠিকাদার কাজ পাওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন, যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থার অপব্যবহার ও পর্দার আড়ালের সিন্ডিকেট নিয়ে অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, অতীতে প্রভাবশালী কিছু ঠিকাদার কাগজে-কলমে শক্তিশালী প্রোফাইল দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কাজ পাচ্ছেন। কিন্তু তারা নিজেরা কাজ না করে পর্দার আড়ালে থেকে একাধিক ধাপে কাজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। দাম কমতে কমতে শেষ পর্যায়ে যে ঠিকাদার কাজ করেন, তিনি বাধ্য হয়ে নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করেন। এর ফলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংসদ সদস্যের এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও উদ্বেগের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করে সমাপনী বক্তব্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের এই বাস্তব সমস্যার বিষয়ে সরকার পুরোপুরি অবগত। কাজের হাতবদল এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজ ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি সংসদকে আরও আশ্বস্ত করে জানান, যোগ্য স্থানীয় ঠিকাদাররা যাতে ন্যায্যভাবে কাজ পান এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়, সে লক্ষ্যে বিদ্যমান পিপিআর পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।