
আমদানি ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং রপ্তানি আয়ের ধীর গতির কারণে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। গত পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আর এই বিশাল ঘাটতির সিংহভাগই তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে।
আজ সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দিন আহমেদের একটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের লিখিত উত্তরে দেশের অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
সংসদকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, ভুটান ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দৃশ্যমান থাকলেও ভারতের সঙ্গেই এই ব্যবধান সবচেয়ে প্রকট। সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাণিজ্যিক এই ভারসাম্যহীনতার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের ভুল নীতির কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিও এতে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্প কাঁচামাল আমদানির উচ্চ ব্যয় এবং রপ্তানির তুলনায় ধীর প্রবৃদ্ধি বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত পাঁচটি অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে—২০২০-২১ অর্থবছরে ১৬.২৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৮.১৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭.১৮ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১.৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে দেশে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির তুলনামূলক চিত্রও সংসদ অধিবেশনে পেশ করেন মন্ত্রী। বিগত পাঁচ অর্থবছরে (ধারাবাহিকভাবে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল যথাক্রমে—৪৫.৩৬, ৬০.৯৭, ৫৩.৯২, ৫১.১১ এবং ৫৫.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে একই সময়ে আমদানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে যথাক্রমে—৬১.৬০, ৮৯.১০, ৭৮.২৯, ৭২.৬১ এবং ৭৯.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তবে এই বিশাল বাণিজ্যিক ব্যবধান কমিয়ে আনতে এবং বিশ্ববাজারে দেশীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২০২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করেছে। তবে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে আসে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে প্রণোদনা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
রপ্তানি ঝুড়ি সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য, ওষুধ, আইসিটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক খাতে রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট (ওডিওপি)’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যার আওতায় ৬৪ জেলার মধ্যে ১৪টি পণ্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে এফটিএ সইয়ের তৃতীয় দফা আলোচনা ২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে সংসদকে অবহিত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।