
দেশের শেয়ারবাজারের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। দীর্ঘ প্রশাসনিক ও করপোরেট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এবং ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খানকে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির শূন্য হওয়া তিনটি কমিশনার পদে নিয়োগ পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আর্থিক খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবী তানভীর হাবিব রহমান এবং ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিজ-আল-তারিক।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই চার হেভিওয়েট প্রার্থীর নিয়োগ চূড়ান্ত করার কথা জানানো হয়। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা আগামী চার বছরের জন্য এই তদারকি সংস্থার দায়িত্ব সামলাবেন। আজ বিকেল ৩টা নাগাদ তাদের বিএসইসি কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করার কথা রয়েছে।
এর আগে পুঁজিবাজারে চরম অস্থিরতার মুখে বিএসইসির সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং তিন কমিশনার—মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন সরকারের কাছে তাদের পদত্যাগপত্র দাখিল করেন।
পুঁজিবাজারের অংশীজন ও বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিপর্যস্ত শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনরুদ্ধার করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাজারের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাই হবে এই নতুন প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ৫(২) ধারা মোতাবেক মাসুদ খানকে সংস্থাটির নতুন চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে পরবর্তী চার বছর পর্যন্ত তাঁর এই নিয়োগ কার্যকর থাকবে।
নিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক শর্তানুসারে, বিএসইসির সর্বোচ্চ আসনে বসার পূর্বে তাঁকে বর্তমানের অন্য সব লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক সংগঠনের সঙ্গে বিদ্যমান সব ধরনের কর্ম-সম্পর্ক ও পেশাগত পদ সম্পূর্ণ ছিন্ন করতে হবে। তাঁর মাসিক বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
করপোরেট ব্যবস্থাপনা, করপোরেট ফিন্যান্স ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করা মাসুদ খান বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
এর আগে তিনি টানা ১৮ বছর লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর হয়ে দেশ ও বিদেশের মাটিতে প্রায় ২০ বছর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল আর্থিক পদে দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ, সিঙ্গার বাংলাদেশ এবং কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মতো দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীন পরিচালক বা ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত আছেন।
উল্লেখ্য, ৭১ বছর বয়সী এই দক্ষ করপোরেট নির্বাহীকে বিএসইসির নেতৃত্বে নিয়ে আসার পথ সুগম করতে সম্প্রতি বিএসইসির মূল আইনে বড় ধরনের সংশোধনী আনা হয়েছিল। গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে চেয়ারম্যান পদের জন্য আগের নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৬৫ বছরের বয়সসীমার বাধ্যবাধকতাটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়। আর এর মাধ্যমেই মাসুদ খানের বিএসইসি প্রধান হওয়ার সব আইনি জটিলতার অবসান ঘটে।