
ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার জেরে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা (শিপব্রেকিং) শিল্প। ভাঙার (স্ক্র্যাপ) উদ্দেশ্যে আমদানি করা ‘মেমেই’ (Memei) নামের একটি বিশাল কেমিক্যাল ট্যাংকার জাহাজের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এটি এখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে (আউটার অ্যাঙ্করেজ) অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। তীব্র আইনি ও বাণিজ্যিক জটিলতার মুখে প্রায় ৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের এই জাহাজটি স্ক্র্যাপ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে এর মূল মালিকের কাছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘এসএন করপোরেশন’।
ঘটনার সময়রেখা ও জাহাজের বিবরণ
আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংক্রান্ত তথ্য ও জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ৪৪ হাজার ৮০০ টন ধারণক্ষমতার রাসায়নিক ও তেলবাহী ট্যাংকার ‘মেমেই’ (আইএমও: ৯১৩৩০৮২) গত ২২ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছায়। ১৯৯৭ সালে নির্মিত পালাউয়ের পতাকাবাহী এই জাহাজটি মূলত সমুদ্রপথে তেল ও রাসায়নিক পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো।
জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর মাত্র ছয় দিনের মাথায়, গত ২৮ we মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) এটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জাহাজটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনে জড়িত ছিল। শুধু জাহাজটিই নয়, এর নিবন্ধিত মালিক হংকংভিত্তিক ‘এভার শাইনিং লিমিটেড’কেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
এক নজরে ‘মেমেই’ সংকট
জাহাজের ধরন: কেমিক্যাল ও তেলবাহী ট্যাংকার (আইএমও: ৯১৩৩০৮২)।
ধারণক্ষমতা ও নির্মাণ: ৪৪,৮০০ টন; নির্মিত ১৯৯৭ সালে (পালাউ-পতাকাবাহী)।
আর্থিক মূল্য: আনুমানিক স্ক্র্যাপ মূল্য ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা)।
আমদানিকারক: শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘এসএন করপোরেশন’।
বর্তমান অবস্থান: চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি সমুদ্র সৈকত থেকে কিছু দূরে বহির্নোঙরে নোঙর করা।
অজান্তে কেনা ও বিচিং বাতিলের সিদ্ধান্ত
জাহাজ রিসাইক্লিং বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে জাহাজটি ভাঙার জন্য বাংলাদেশের আমদানিকারকের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। তবে ক্রয়ের সময় এই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সম্পূর্ণ অজানা ছিল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য এই প্রতিবেদককে বলেন, "জাহাজটি ক্রয় করার পর আমদানিকারক জানতে পারেন যে এটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। আগে এই খবর পাওয়া গেলে এসএন করপোরেশন কোনোভাবেই জাহাজটি ক্রয় করত না। বিষয়টি জানার পর আইনি জটিলতা এড়াতে জাহাজটি আর ইয়ার্ডে বিচিং (সৈকতে ভেড়ানো) না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটিকে মূল মালিকের কাছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।"
স্থানীয় শিল্পে উদ্বেগ ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি উপকূলের কাছে আটকে থাকা এই জাহাজটি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যেও এক ধরনের বাণিজ্যিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। শিপব্রেকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে এভাবে কোটি কোটি টাকা মূল্যের আমদানিকৃত জাহাজ ফেরত পাঠাতে হওয়া স্থানীয় স্ক্র্যাপ খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক যেকোনো জাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে এলসি (LC) খোলার আগে তার আন্তর্জাতিক ট্র্যাক রেকর্ড, ওএফএসি (OFAC) স্ট্যাটাস এবং মালিকানার ইতিহাস আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করা উচিত, অন্যথায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এমন বিশাল আর্থিক ও আইনি ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হবে।