
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ আবার বিশ্বমঞ্চের এই সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসার গৌরব অর্জন করল।
জাতিসংঘের মোট ৬টি প্রধান অঙ্গের মধ্যে সাধারণ পরিষদকে বলা হয় ‘বিশ্বের সংসদ’। এটিই জাতিসংঘের একমাত্র অঙ্গ যেখানে বিশ্বরাজনীতির কোনো বৈষম্য নেই; আমেরিকা থেকে শুরু করে ছোট কোনো দ্বীপ রাষ্ট্র—সব ১৯৩টি সদস্য দেশেরই ভোটের মূল্য সমান (১টি দেশ, ১টি ভোট)। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে এই পরিষদের মূল বার্ষিক অধিবেশন বসে, যেখানে বিশ্বনেতারা সমবেত হন।
এই বিশ্ব সংসদের শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে আগামী এক বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সভাপতির মূল দায়িত্বসমূহ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি (পিজিএ) পদটিকে বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম শীর্ষ সম্মানজনক পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক বছরের মেয়াদে খলিলুর রহমানের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে থাকবে:
অধিবেশন পরিচালনা: সাধারণ পরিষদের সব উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, সাধারণ বিতর্ক ও বিশেষ অধিবেশনসমূহ নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করা।
মধ্যস্থতা ও সমন্বয়: বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট, যুদ্ধ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এজেন্ডা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং ভোটাভুটির নেতৃত্ব দেওয়া।
বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব: জাতিসংঘের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নেওয়া এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ পরিচালনা করা।
যেসব সুবিধা ও প্রটোকল পাবেন খলিলুর রহমান
ইউএনজিএ-র সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সমমানের প্রটোকল ও বিশেষ সুবিধাদি ভোগ করবেন। এর মধ্যে রয়েছে:
জাতিসংঘ সদরদপ্তরে স্থায়ী অফিস: নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের মূল ভবনে তাঁর জন্য একটি বিশেষায়িত ও সুসজ্জিত অফিস বরাদ্দ থাকবে। একই সাথে তাঁর কাজ পরিচালনায় একটি নিজস্ব কূটনৈতিক স্টাফ বা সচিবালয় দেওয়া হবে।
সর্বোচ্চ প্রটোকল ও নিরাপত্তা: নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্তরের কূটনৈতিক প্রটোকল, বিশেষ গাড়ি এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
বিশ্ব সফর: দায়িত্ব পালনকালে তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন এবং সেখানে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সমতুল্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত হবেন।
উল্লেখ্য, এটি জাতিসংঘের একটি অনারারি বা সম্মানসূচক রাজনৈতিক পদ হওয়ায় সভাপতির মূল বেতন এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ভার সাধারণত তাঁর নিজের দেশ (বাংলাদেশ সরকার) বহন করবে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক লাভ কী?
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুর রহমানের এই ঐতিহাসিক অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ১৯৩টি দেশের নীতি নির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশ।
এর ফলে বাংলাদেশ চাইলে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট কিংবা স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের মতো নিজেদের অতিগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে বিশ্বমঞ্চের মূল এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারবে। পাশাপাশি, বিশ্বের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিকদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
৪০ বছর আগের সেই গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি
এর আগে ১৯৮৬ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই গৌরব এনেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব ও পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তৎকালীন শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাকর আবহের মধ্যেও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশন পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর সেই সভাপতিত্বের সময়েই জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা সরকারিভাবে ব্যবহারের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ চার দশক পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ আবারও বিশ্ব কূটনীতির সেই স্বর্ণালী অধ্যায়ে প্রবেশ করল।