
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে গড়ে ওঠা গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণের সুদের হার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে উচ্চ আদালত। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের ওপর আরোপিত চড়া সুদের হার কেন দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তা জানতে চেয়েছেন হাই কোর্ট।
জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আজ সোমবার (১৮ ১৮ মে) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। এই মামলায় গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও বিবাদী করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর ফাঁকিসহ একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আনা হয়েছে রিট আবেদনে।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাসুদ আর সোবহান এবং অ্যাডভোকেট ফাতেমা চৌধুরী।
মামলার আদেশের বিষয়ে আইনজীবী ফাতেমা চৌধুরী জানান, রিটটি গত সপ্তাহে দায়ের করা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কিছু আপত্তি থাকায় তাদের বক্তব্য শোনার পর আজ আদালত এই আদেশ দেন। আদালত মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর রুল ইস্যু করেছেন। প্রথমত, গ্রামীণ ব্যাংকের সাধারণ ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি, যা অত্যন্ত চড়া। এই হার হ্রাস করে কেন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে মেলানোর নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের সাধারণ ব্যাংকিং নিয়মে কেউ ১০০ টাকা লোন নিয়ে ৩০০ টাকা ফেরত দিলে তাকে বাকি ঋণ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক আইনে এমন কোনো নিয়ম না থাকায় দরিদ্র ও ভূমিহীন ঋণগ্রহীতারা বছরের পর বছর ধরে ঋণের ফাঁদে আটকে থাকেন। গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহকদেরও যেন এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়, রুলে সেটিও জানতে চেয়েছেন আদালত। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, আবেদনে উল্লেখ থাকলেও তারা শুনানিতে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাননি, ফলে আদালতও তা দেননি।
রিট আবেদনে মূলত অভিযোগ করা হয়েছে যে, গ্রামীণ ব্যাংক গ্রামীণ ভূমিহীনদের জন্য যে মাইক্রোক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালায়, তার সুদের হার প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় অত্যন্ত চড়া ও শোষণমূলক। এই শোষণ বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, রুলে সেটিই জানতে চাওয়া হয়েছে। মামলায় মোট চারজনকে বিবাদী করা হয়েছে; তারা হলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনূস।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে একটি বিশেষ সামরিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের দরিদ্র ও ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে নারীদের জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ‘গ্রামীণ ব্যাংক আইন’ পাস করে এর কার্যক্রম চালানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৫ সালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই আইনে সংশোধন এনে একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে ব্যাংকের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে গ্রাহকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৮৩ সাল থেকে টানা ২৮ বছর এই ব্যাংকের শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানের জন্য ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূস যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বয়সসীমা ৬০ বছর পার হওয়ার কারণ দেখিয়ে তাকে এই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর তিনি আর এই পদে ফিরতে পারেননি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকের চড়া সুদ এবং ড. ইউনূসের তীব্র সমালোচনা করতেন এবং তাকে ‘রক্তচোষা’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আমলে তার বিরুদ্ধে হওয়া ফৌজদারি মামলার রায় বাতিল করা হয়।
রিটকারী আইনজীবী মাসুদ আর সোবহান সুদের হারের পাশাপাশি ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। রিটে দাবি করা হয়, অধ্যাদেশ অনুযায়ী এমডির বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারিত থাকলেও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে প্রভাবিত করে ইউনূস বেআইনিভাবে আরও ৫ বছরের জন্য নিয়োগ পান। ৬৫ বছর পার হওয়ার পর তিনি আবারও মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানালে অর্থ মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে দেয়, যা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে। এরপর থেকে তিনি ‘পরামর্শক’ হিসেবে পর্দার আড়াল থেকে ব্যাংকের নীতি নির্ধারণ করে আসছেন বলে পিটিশনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া কর ফাঁকি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের লভ্যাংশ দিয়ে ড. ইউনূস একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেন, যার ট্রাস্টিরা তার আপন আত্মীয়। ওই ফান্ডের আয়ের ওপর তিনি আয়কর দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে কর কর্তৃপক্ষ তা আদায় করেছিল।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে রিটে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ড. ইউনূস যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই গ্রামীণ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত ৬৭৭ কোটি টাকা (৫৫ মিলিয়ন ডলার) আয়কর সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়। নিজের পদে থেকে এই বিশাল অংকের কর মওকুফ করিয়ে নেওয়া আর্থিক লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি স্পষ্ট উদাহরণ বলে রিটকারী দাবি করেছেন। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের অসংখ্য কর্মীকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ এনে বলা হয়, পরবর্তীতে কর্মচারীরা শ্রম আদালতে মামলা করে জয়ী হওয়ার পর ব্যাংক তাদের পাওনা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছিল।