
দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার ১৪ জানুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত ছয়টি জাহাজ ক্রয় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ঘোষিত লভ্যাংশ থেকে সরকারের প্রাপ্য অর্থ হস্তান্তর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী কিস্তি ও লভ্যাংশ বাবদ মোট দুইশ তিন কোটি সাতচল্লিশ লাখ টাকার চেক প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন এবং বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক প্রধান উপদেষ্টার হাতে চেক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিএসসি, তা ধরে রাখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে এই প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানই আরও শক্তিশালী হয়, বহরে নতুন নতুন জাহাজ যুক্ত হয়।” তাঁর মতে, বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা বাড়লে নাবিকদের মধ্যে উৎসাহ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মেরিন খাতের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী দিয়ে ধরে রাখতে হবে, যাতে তারা বিশ্বমানের নাবিক তৈরি করতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানান, জি-টু-জি ভিত্তিতে ছয়টি জাহাজ ক্রয় বা সংগ্রহের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকার ও চীন সরকারের মধ্যে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে তিনটি নতুন প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং তিনটি নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহ করা হয়, প্রতিটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৩৯ হাজার ডিডব্লিউটি। উক্ত ঋণের মূল অর্থের পরিমাণ ছিল ১,১৯৯,৯৯৯,০৭০ ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার চারশ সাতান্ন কোটি সাতষট্টি লাখ আটানব্বই হাজার সাতশত পঁচাশি টাকা।
তিনি আরও জানান, ওই ঋণ পরিশোধের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সরকারের অর্থ বিভাগ ও বিএসসির মধ্যে আরেকটি সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় আগামী ১৩ বছরের মধ্যে বিএসসি মোট ২,৪২৫.০২ কোটি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পরিশোধ করবে।
বিএসসির আর্থিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বশেষ অর্থবছরে সংস্থাটি প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় করে সর্বোচ্চ ৩০৬.৫৬ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। এই ধারাবাহিক অগ্রগতিতে প্রকল্পের মাধ্যমে বহরে যুক্ত পাঁচটি জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার আলোকে বিএসসি ইতোমধ্যে নতুন জাহাজ সংগ্রহে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দুইটি বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের অংশ হিসেবে প্রথম জাহাজ ‘বাংলার প্রগতি’ ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ডেলিভারি গ্রহণের পর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় জাহাজ ‘বাংলার নবযাত্রা’ আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ডেলিভারির জন্য নির্ধারিত রয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি অর্থায়নে দুইটি এমআর প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং নিজস্ব অর্থায়নে একটি আল্ট্রাম্যাক্স আকারের বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান। এ ছাড়া চীন থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে আরও চারটি বড় আকারের নতুন মাদার ভেসেলসহ অতিরিক্ত জাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।