
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রেসসচিব শফিকুল আলম ফোন করে চাকরি হারানোর হুমকি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, একটি সংবাদ প্রকাশের পর তাকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয় এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিগতভাবে হুমকির মুখে পড়েন তিনি।
মহিউদ্দিন সরকার বলেন, এক সময় ফোনে তাকে চাকরি ‘খেয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে আরও চাপ সৃষ্টি হলে তিনি পরিবারসহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন।
সাবেক প্রেসসচিব শফিকুল আলমের কাছ থেকে সরাসরি হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই। অফিস শেষে জিম করে প্রতিদিনকার মতো গুলশান-১-এর গ্লোরিয়া জিনস কফিশপে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আনুমানিক সোয়া ১০টার দিকে হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।
প্রেসসচিব শফিক ভাইয়ের ফোন। কী যেন একটা নিউজ নিয়ে কথা বললেন। বেশ উত্তেজিত মনে হলো। আমি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করে বিষয়টা দেখছি বলে উনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু না; উনি মালিকের কাছে অভিযোগ, চাকরি খেয়ে দেওয়াসহ আরো কী কী যেন বললেন।’
বিষয়টি তখন অন্যরকম মনে হওয়ার কথা জানিয়ে মহিউদ্দিন সরকার লেখেন, ‘শফিক ভাইয়ের সঙ্গে জাগো নিউজ থেকে আমার সম্পর্ক ও পরিচয়। মাঝে মাঝে কথা হতো। কিন্তু সেদিনের বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতাম ড. ইউনূসের প্রেস উইং ঢাকা পোস্টের ব্যাপারে খুবই নেগেটিভ।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে কার্ড দেয়নি ঢাকা পোস্টকে। আটকে দিয়েছিলেন এসবি পাস। বিশেষ করে আমার ব্যাপারে সহকারী প্রেসসচিব নাকি বেশি নেগেটিভ ছিলেন।’
তিনি আরো লেখেন, ‘সেই থেকেই বুঝতে চেষ্টা করছিলাম সমস্যাটা আসলে কোন জায়গায়। আমার কাজ করা দুটি হাউস জাগো নিউজ ও ঢাকা পোস্ট কখনোই কোনো দল বা গোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন করেনি। যতটুকু সম্ভব স্বাধীন সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছে। আমার সহকর্মীদের সবাই অকপটে এ সত্যটি বলবে। আর সে কারণেই এখনো বাজারে দুটি প্রতিষ্ঠানই পাঠকের প্রিয় হয়ে আছে।’
এরপরে আরো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার তথ্য তুলে ধরেন সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার। তিনি লেখেন, ‘এর পরের ঘটনাটা তো সবারই জানা। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকে নিম্নমানের কাগজ ও আসিফ নজরুল এবং মাহফুজের নাম করে এক এনসিপি নেতার বেপরোয়া বাণিজ্যের নিউজ প্রকাশ হলো ঢাকা পোস্টে। সারা দেশে শুরু হলো তোলপাড় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টা ভাইরাল হয়ে গেল। আমার ডাক পড়ল তথ্য মন্ত্রণালয়ে। ঢাকা পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার নূর মোহাম্মদ ও আমি সাড়ে ৫টার দিকে উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করলাম। এক ঘণ্টার সেই মিটিং নিয়ে আরেক দিন লিখব।’
এর মধ্যেই ঢাকা পোস্টে হামলার হুমকি আসতে শুরু করে। মহিউদ্দিন সরকার লেখেন, ‘আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোনে হত্যার হুমকিসহ আমার ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো প্রকাশ্যে ফেসবুকে। অবস্থা বেগতিক দেখে রাতে উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ফোন করে আমার খবর নিলেন। বললেন, উপদেষ্টা নিজেও উদ্বিগ্ন আমার নিরাপত্তা নিয়ে।’
তিনি আরো লেখেন, ‘আমার ওপর হামলার হুমকি বা পরদিন মামলা করার পর মোটেও বিচলিত হইনি। কিন্তু আমার ছেলেমেয়েকে তুলে নেওয়ার হুমকির বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। কারণ ওদের দুজনের স্কুল ছিল ঢাবি ক্যাম্পাসের উদয়ন স্কুল। ভয় পেয়ে ওদের স্কুলে যাওয়াটা বন্ধ করে দিই। আর তখন ঢাবি ক্যাম্পাসে গিয়ে স্কুলে ক্লাস করার মতো পরিবেশও ছিল না। ঘটনার ঠিক ১০-১২ দিন পর বাড্ডা থানার একজন এসআই ফোন দিলেন। আমি মনে করেছিলাম এনসিপি নেতার মানহানির মামলার ব্যাপারে কথা বলবেন। কিন্তু না, শুনলাম বাড্ডা থানার একটা হত্যাচেষ্টা মামলায় আমার নাম। তখন আর বুঝতে বাকি রইল না ঘটনাটা ধীরে ধীরে কোন দিকে মোড় নিচ্ছে।’
আক্ষেপ নিয়ে এই অভিজ্ঞ সাংবাদিক লেখেন, ‘দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে কখনোই কারো কোনো ক্ষতি করেছি মনে পড়ে না। পেশাগত কারণে হয়তো অনেকের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেছি বা চাকরিতে না বলেছি অনেককে। সেটা অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে অথবা তার ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে। পেশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো কাজ করেছি বলে মনে হয় না।’
তিনি লেখেন, ‘এর মধ্যেই সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতে পেলাম ঢাকা পোস্টের সম্পাদক পদের জন্য কেউ কেউ চেষ্টা-তদবির করছিলেন। আমি নিজের চাকরি নিয়ে কখনোই উদ্বিগ্ন ছিলাম না। বিষয়টি নিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলাম। সে-ও বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। এর মধ্যেই বিভিন্ন মিডিয়া হাউস দখল/সম্পাদক বদল হতে লাগল। তারপর আর যা হওয়ার, তা-ই হলো। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করলাম। শেষতক দেশ ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তই নিলাম। অনেক বড় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত। অনেক মিস করি জন্মভূমি বাংলাদেশকে। অনেক মিস করি আমার সহকর্মীদের। আমি জানি সহকর্মীরা আমার ওপর রেগে আছে। কারণ তাদের কারো কাছেই বিদায় নিয়ে আসতে পারিনি। আমার পরিবারের একান্ত আপনজন হয়ে ওঠা আমার ড্রাইভার স্বাধীনকেও বলে আসতে পারিনি। সবাইকে খুব মিস করি।’
মহিউদ্দিন সরকার লেখেন, ‘গত বছর ঈদুল আজহার পরদিন সকালে সপরিবারে দেশ ছেড়ে চলে আসি। ওই দিন না হলে হয়তো আসতেই পারতাম না। দেশ ছেড়ে আসার পরও শুনলাম আরেকটি মামলার খবর। সেটাও বাড্ডা থানায়। মোটামুটি একই ধরনের মামলা।’
সর্বশেষে তিনি লেখেন, ‘আজ মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। নিজের কিছু কষ্টের কথা শেয়ার করলাম বন্ধুদের সঙ্গে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারের সময়ে গণমাধ্যম ভালো থাকুক, ভালো থাকুক আমার পেশার মানুষজন।’
প্রসঙ্গত, ড. ইউনূসের শাসনামলে তার প্রেসসচিব শফিকুল আলম একাধিকবার দাবি করেন, দেশের সংবাদমাধ্যম ‘ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা’ ভোগ করছে। গত বছরের ১৫ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘গত ৯ মাস ধরে অভূতপূর্ব স্বাধীনতা ভোগ করছে গণমাধ্যম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা চাকরি হারিয়েছেন, তা গণমাধ্যমের মালিক নিজেকে রক্ষায় ছাঁটাই করেছেন। তাদের চাকরিচ্যুত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করেনি।’
এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গণমাধ্যম স্বাধীন। গত ৫৩ বছরে স্বাধীনতার পর গণমাধ্যমে এত বেশি স্বাধীনতা কেউ কোনো দিন এনজয় করেননি।’