
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা থানা এলাকায় তিনটি খ্রিষ্টান পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, জোর করে দুর্গাপূজার মণ্ডপে নিয়ে ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করা এবং এক নারীকে প্রকাশ্যে ‘শুদ্ধীকরণের’ নামে গোসল করানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
১৮ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাঁদের বাড়ির আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা কাটেনি। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টা, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন, নারীর শ্লীলতাহানি ও ডাকাতির অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ।
হামলা, মারধর ও ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করা
নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের একজন ৪০ বছর বয়সী নারী। তাঁর পরিবার তামা ও অন্যান্য ধাতু দিয়ে গয়না তৈরির কাজ করে। ওই নারী জানান, গত ১৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে তিনটার দিকে একদল ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে ও আমার স্বামীকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে মারধর করে। মাটিতে ফেলে আমার কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। এরপর আমাকে তুলসীপাতা ও বেলপাতা খেতে বাধ্য করা হয় এবং শুদ্ধীকরণের আচার হিসেবে গায়ে পানি ঢালা হয়। সবাই দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল।’
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা ওই পরিবারের সদস্যদের খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করার জন্যও চাপ দেয়।
প্রথম দফার হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পাশের আরও দুটি খ্রিষ্টান পরিবারের বাড়িতে প্রবেশ করে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের মারধর করার পাশাপাশি নগদ ২০ হাজার রুপি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় পুলিশকে জানালে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়।
পুলিশকে জানানোর পর ফের হামলার অভিযোগ
ভুক্তভোগী নারী জানান, তাঁরা ১০০ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাঁদের বক্তব্য শুনে চলে যাওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর সকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আবার ফিরে আসে।
পুলিশকে খবর দেওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে হামলাকারীরা তিন পরিবারের সদস্যদের পাশের একটি গ্রামের দুর্গাপূজার মণ্ডপে জোর করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সেখানে তাঁদের অঞ্জলি দিতে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবেশী দুই খ্রিষ্টান পরিবারের একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরদিন ২০ অক্টোবর তিন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে গিয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে জানান ওই নারী। সেদিনগুলোর পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘তারা বাড়ি ফিরে কাঁদছিলেন। তিনদিন আমাদের ওপর দিয়ে ভয়াবহ গেছে। ভয়ে তিন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। পরে সম্প্রদায়ের লোকজনের পরামর্শে থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয় এবং পুলিশ এসে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।’
মামলা হলেও গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বেগ
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়া কলকাতা হাইকোর্টের এক আইনজীবী জানান, ২০ অক্টোবর তিনি থানায় যাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত এফআইআর নথিভুক্ত করে। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ কারণে পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, এ ঘটনার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, ‘তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন, তাই আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে থানায় নিয়ে আসি এবং অভিযোগ গ্রহণ করি। তারা বাড়ি ফিরে যেতে চাওয়ায় তাদের বাড়ির কাছে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সুরক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
বাড়ির বাইরে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক ও অসুস্থ সদস্যদের সুরক্ষা নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা কাটছে না।