
অর্থনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনা ও কূটনীতির প্রধান হাতিয়ারগুলোর একটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুল্ক আরোপ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, কৌশলগত সম্পদ ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য জরুরি উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত সেপ্টেম্বরে এক বক্তৃতায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) উপপরিচালক মাইকেল এলিস জানান, চীনকে ঘিরে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জৈবপ্রযুক্তি এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
চীনের বৃহৎ কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থার অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের বিষয়টি এভাবে প্রকাশ্যে তুলে ধরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিরল।
সিআইএর সাবেক উপপরিচালক ডেভিড এস কোহেন অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে আরও বিস্তৃত উদ্যোগের পক্ষে মত দিয়েছেন। ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার দীর্ঘদিনের নীতি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে তাদের সঙ্গে এ ধরনের তথ্য ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
এক সাক্ষাৎকারে কোহেন বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছি। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে আমাদের দ্বিধায় থাকা উচিত নয়।’
তবে এভাবে বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতি প্রতিরোধে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পেন্টাগনের নতুন এনওসি কর্মসূচি সম্পর্কে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই বলেও জানান কোহেন।
অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষায় নতুন ইউনিট
পেন্টাগনের অর্থনৈতিক যুদ্ধের কিছু উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। চলতি বছর স্টিভ ফেইনবার্গ ‘ইকোনমিক ডিফেন্স ইউনিট’ (ইডিইউ) গঠনের ঘোষণা দেন।
পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পাঠানো এক স্মারকে ফেইনবার্গ জানান, অর্থনৈতিক উপায় কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি, তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ এবং পরাজিত করাই এ ইউনিটের প্রধান উদ্দেশ্য। মার্কিন প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্সস্কুপ প্রথম স্মারকটির খবর প্রকাশ করে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ফেইনবার্গ তাঁর সাবেক সহকর্মী ও পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জর্জ কলিটাইডসকে ইডিইউর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর থেকে ইউনিটটি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন খনি এবং শোধনাগারে শত শত মিলিয়ন ডলারের সরকারি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
এ ধরনের একটি চুক্তির অংশ হিসেবে ব্রাজিলের বিরল মৃত্তিকা খনিজের একটি বড় মজুত সুরক্ষিত করতে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে পেন্টাগন।
প্রকাশ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাকুসান গোপনে একটি নতুন গোয়েন্দা শাখা গড়ে তোলার কাজও তদারকি করছেন।
পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একাধিক ব্যক্তির মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে ইডিইউকে গোপন ওই ইউনিটের সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ইউনিটটির কার্যক্রম ও বিনিয়োগ নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাদ দেওয়া হয়।
বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে আবার শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হলে পেন্টাগনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অতীতের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ
সিআইএর গোপন ছদ্মবেশী গোয়েন্দা বা এনওসি কর্মসূচির ইতিহাসে যেমন সাফল্য রয়েছে, তেমনি আছে ব্যর্থতার নজির। অতীতে বড় পরিসরে এ ধরনের কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করা হলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দুর্বল তদারকির কারণে অনেক উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
২০০০-এর দশকে মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির সমর্থনে ‘গ্লোবাল ডেপ্লয়মেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। তবে দ্রুত বিপুলসংখ্যক ছদ্মবেশী গোয়েন্দা নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক তরুণ গোয়েন্দাকে সিআইএর সদর দপ্তরে ফিরে যেতে হয়েছিল, নয়তো চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
গভীর ছদ্মবেশে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে পেন্টাগনও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়েছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) এবং জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (জেএসওসি) বাণিজ্যিক পরিচয় ব্যবহার করে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করলেও সব ক্ষেত্রে সফলতা আসেনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর পরিচালিত একটি অভিযানে আফ্রিকার দুর্গম অঞ্চলে জেএসওসির কয়েকজন সদস্য খনি কোম্পানির কর্মী পরিচয়ে কাজ করছিলেন। কিন্তু খনিবিষয়ক অভিজ্ঞ কয়েকজন ভূতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীর মুখোমুখি হওয়ার পর তাঁদের ছদ্মবেশ ধরা পড়ে। খনিসংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়েও পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় তাঁদের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
ওই ঘটনায় তাঁরা কোনোভাবে উদ্ধার পেলেও পরবর্তী সময়ে জেএসওসি বাণিজ্যিক পরিচয়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো শুরু করে।
সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পেন্টাগনের পক্ষে এ ধরনের গভীর ছদ্মবেশী গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের অতীত পুরোপুরি গোপন রাখা সহজ নয়। এর পাশাপাশি আধুনিক বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের বিস্তারের কারণে ভুয়া পরিচয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে অভ্যস্ত কর্মকর্তাদের চলাফেরা, আচরণ ও শারীরিক ভঙ্গি থেকেও তাঁদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে।
সিআইএর চেয়ে বেশি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী পেন্টাগন?
পেন্টাগনের নতুন উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে ক্ষমতা ও প্রভাবের ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। বর্তমানে পেন্টাগন ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা দেড় লাখ কোটি ডলারের রেকর্ড বাজেট চাচ্ছে।
অন্যদিকে, সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ বিদেশে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিস্তারের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের গোপন তথ্য সংগ্রহে আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সিআইএ এখনো তুলনামূলক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে পেন্টাগন বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিআইএর সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পেন্টাগনের বিপুল অর্থ, আইনি ক্ষমতা ও সক্ষমতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘তাদের প্রচুর অর্থ, আইনি ক্ষমতা এবং সক্ষমতা রয়েছে। ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন।’