
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তারপরও সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলা মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ভাষ্য, ঝুঁকি সীমিত হলেও দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান পরিবর্তিত বাস্তবতায় সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা সরকারের দায়িত্ব।
সম্প্রতি কার্নি বলেন, বিষয়টি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তার বারবার মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্ক আগের অবস্থায় নেই।
যুদ্ধের সম্ভাবনা কম, তবু প্রস্তুতিতে জোর
২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রায় নেই। তবে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসও এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, কানাডার জনগণের নিরাপত্তায় ট্রাম্প অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় বেশি করেছেন।
কানাডার সামরিক বিশেষজ্ঞদেরও মত, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য। উত্তর আমেরিকার আকাশসীমা ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাডের মাধ্যমে দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। পাশাপাশি নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও করে তারা।
রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ৩৪ বছর দায়িত্ব পালন করা সাবেক লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, তাঁর সামরিক জীবনে কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডায় হামলার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়নি। দুই দেশের গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে এমন যুদ্ধ শুরু হলে তা অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠবে এবং বাস্তবে এমন পরিস্থিতি কল্পনা করাও কঠিন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিলে সেটি সরাসরি সামরিক হামলা দিয়েই শুরু হবে—এমনটা মনে করেন না কোটস। তাঁর মতে, সাইবার হামলা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
অতীতেও মার্কিন হামলার মুখোমুখি কানাডা
বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ইতিহাসে সবসময় এমন ছিল না। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বাহিনী মন্ট্রিয়েল দখল করেছিল এবং কুইবেক সিটি দখলের চেষ্টাও চালিয়েছিল।
এর কয়েক দশক পর ১৮১২ সালের যুদ্ধে তৎকালীন কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়। ওই সংঘাতের একপর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ওয়াশিংটনে পৌঁছে হোয়াইট হাউসে আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল কানাডা। সে সময় কানাডার সামরিক কর্মকর্তারা পর্যটকের ছদ্মবেশে সীমান্তসংলগ্ন মার্কিন শহরগুলোতে ঘুরে বেড়ান এবং সেতু, মহাসড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর তথ্য সংগ্রহ করেন।
বর্তমানেও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে কানাডা। একটি সামরিক মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোর কিছু এক সপ্তাহের মধ্যেই দখল হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডীয় বাহিনীকে গেরিলা-ধাঁচের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হতে পারে এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্রদের সহযোগিতা চাইতে হতে পারে।
হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী হলেও কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো ওয়াশিংটনের জন্যও সহজ হবে না। দীর্ঘদিনের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দুই দেশের সেনাদের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরেও এমন অভিযানের রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিটের মতে, সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তেল, খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অকার্যকর করার দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
তবে সামরিক শক্তি ও জনবলের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও কানাডার বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে কানাডার সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে লেজার পরিচালিত এক জরিপে ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় জানিয়েছিলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা করছেন।
তাই কানাডার বর্তমান সামরিক প্রস্তুতিকে সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে সামরিক পরিকল্পনার আওতায় এনে প্রস্তুত থাকার কৌশল হিসেবেই বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে।