
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদ দুটি সম্ভাব্য কৌশল বিবেচনা করছে। এর একটি হলো উপকূলীয় এলাকা থেকে হুথিদের সরিয়ে দেওয়া, অন্যটি হলো ইয়েমেনের একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা।
সংশ্লিষ্ট সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছয় কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী স্থল অভিযানে নেতৃত্ব দেবে। তাদের সহায়তায় সৌদি বিমানবাহিনী হামলা চালাবে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিলেও সৌদির কোনো মিত্র সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে না।
বাব এল-মান্দেব পুনর্দখলই প্রধান লক্ষ্য
পরিকল্পিত অভিযানের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হিসেবে গত মাসে হুথিদের আকস্মিক অগ্রযাত্রা থামিয়ে বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সৌদি ও ইয়েমেনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ দুটি সামরিক পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। প্রথম পরিকল্পনায় বাব এল-মান্দেব ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় সীমিত অভিযান চালানোর কথা রয়েছে। দ্বিতীয়টি তুলনামূলক বড় পরিসরের। এতে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ—এই চার গভর্নরেটে একযোগে অভিযান চালানো হতে পারে।
অভিযানের ব্যাপ্তি বড় হলে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুথি নেতৃত্ব কিংবা মার্কিন সামরিক বাহিনী এ পরিকল্পনা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
বাব এল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এবং ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌরুট। ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এই নৌপথের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, হুথিদের হাতে বাব এল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ থাকলে রিয়াদ কোনো শান্তি আলোচনায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। এটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হতে পারে, আবার নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও পিছিয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা, পাশে পাকিস্তান-তুরস্ক
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, সম্ভাব্য অভিযানটি ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের মতো সর্বাত্মক নাও হতে পারে। তার ধারণা, হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করার চেয়ে আপাতত বাব এল-মান্দেব এলাকায় আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে এনে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করাই রিয়াদের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
তবে আঞ্চলিক বাস্তবতায় হুথিদের গুরুত্ব বেড়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হিসেবে হুথিদের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। ফলে নতুন করে ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু হলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের হয়ে সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখালেও ওয়াশিংটন রিয়াদকে সামরিক পরামর্শ ও লক্ষ্য শনাক্তকরণে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্প্রতি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা তুরস্ক ও পাকিস্তান সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করছে। পাকিস্তান এরই মধ্যে চারটি কার্গো বিমানে করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেনে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তার জন্য সৌদি বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও কাজ করছেন। পাশাপাশি তুরস্কে তৈরি সৌদি ড্রোন ইয়েমেনের আকাশে নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থলবাহিনীর বিভক্তিই বড় ঝুঁকি
অভিযান শুরু হলে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের তেলক্ষেত্র ও স্থাপনা রক্ষা করাও সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। এ কারণে পাকিস্তান গত বছর থেকে সাম্প্রতিক উত্তেজনা পর্যন্ত সৌদি আরবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। এসব সেনা মূলত সৌদি স্থলসীমান্তের নিরাপত্তা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করছে।
তবে ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। একই সময়ে ফ্রান্সও সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী ইয়ানবুর নিরাপত্তা জোরদারে সেনা ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
তবে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশিক্ষণ ও সমর্থন পাওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করেই স্থল অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
সামরিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশারের মতে, হুথিদের মতো সংগঠিত একটি বাহিনীকে পিছু হটানোর জন্য সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় ঐক্য এখনো তৈরি হয়নি।
গত শীতে আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী পূর্বাঞ্চল দখলের চেষ্টা চালিয়ে বিচ্ছিন্নতার আহ্বান জানালে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এর ফলে সরকারপন্থী শিবিরের ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, এতদিন মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা। কিন্তু এবার যদি পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু হয়, তাহলে এর সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় স্থলবাহিনীর সামরিক সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ওপর।