
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে তা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে নয়াদিল্লি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সতর্কতার কথা জানায়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই রুশ তেল কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
রুশ তেল কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন উদ্যোগ
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের জেরে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ একটি বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক বিল অনুমোদন করেছে।
এখন বিলটি আইনে পরিণত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে চীন, ভারতসহ রাশিয়ার জ্বালানি কেনে এমন অন্যান্য দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ট্রাম্পকে দেওয়ার কথা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য এসব দেশের রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হওয়ার বিষয়টি তারা লক্ষ্য করেছে। গত কয়েক মাসে এ নিয়ে নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছে।
আলোচনার সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রস্তাবিত পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি ‘খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে’ ভারত।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতের জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নয়াদিল্লি ‘দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ থাকবে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন বিক্রেতার কাছ থেকে জ্বালানি সরবরাহও অব্যাহত রাখা হবে।
একই সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ভারতের দৃঢ় অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার বাণিজ্য ও শিল্প সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
রুশ তেলের বড় ক্রেতা ভারত
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ভারত রাশিয়ার তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রুশ তেল বিক্রি থেকে পাওয়া আয় রাশিয়ার বাজেট পুনরায় পূরণে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য কমানোর জন্য পশ্চিমা চাপের মুখে নয়াদিল্লি বারবার সেই চাপ প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। ভারতের যুক্তি হলো, বিপুল জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে দেশটির নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের জন্য ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো যে তেল সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে, তার মধ্যে রুশ তেলও রয়েছে।
দুটি পরিশোধনাগারের সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে সরকার যেন মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে, তারা সেটিই চায়। তাদের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিলে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ তেলের সরবরাহও কমে গেলে পরিশোধনাগারগুলোর মুনাফায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারণ তারা এরই মধ্যে বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি করছে।
১০০ শতাংশ শুল্কের বদলে ছাড় চায় পরিশোধনাগারগুলো
পরিশোধনাগারগুলো চায়, রুশ তেলের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিবর্তে সরকার যেন কিছুটা ছাড় দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে বর্তমানে চলমান লেনদেনগুলো ধীরে ধীরে শেষ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ভারত কত পরিমাণ রুশ তেল কিনতে পারবে, সে বিষয়েও একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
বাণিজ্য আলোচনা আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে চলমান ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এর ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তি সম্পন্নের প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ‘রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কমাতে এবং একটি গভীরভাবে অসম বাণিজ্য চুক্তি মেনে নিতে ভারতকে চাপ দিতে ওয়াশিংটন শুল্কের হুমকি ব্যবহার করতে পারে।’
বাণিজ্য চুক্তিতে এখনও ঐকমত্য হয়নি
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক মাস ধরে বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো কোনো চুক্তির বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
নয়াদিল্লি আরও ভালো একটি চুক্তি পাওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল চলতি মাসের শেষ দিকে জি২০ বাণিজ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। সেখানে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ওই বৈঠকে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।