
ইরানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি বিদ্যালয় ও একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে চালানো পৃথক দুই সামরিক হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন। এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে—এমন বিশ্বাসের পক্ষে যথেষ্ট কারণও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপনের জন্য প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযান চালানোর সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
ইরান যুদ্ধ ও বিক্ষোভ দমনে দুই পক্ষের ভূমিকা পর্যালোচনা
জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন অন ইরান এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
এতে গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং একই সময়ে ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষ দমনে তেহরানের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জেনেভায় অবস্থিত মার্কিন ও ইরানি স্থায়ী মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী অতীতে দাবি করে এসেছে, তাদের সামরিক অভিযানগুলো সশস্ত্র সংঘাতসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ইরান।
মিনাবের স্কুলে হামলার জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারে তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো হামলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী দায়ী ছিল বলে মনে করার মতো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি তারা পেয়েছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১২০ জন শিক্ষার্থীসহ ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাটি ছিল নির্বিচার। এর ফলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এ ধরনের হামলা স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসির একটি নৌ ঘাঁটির পাশেই। তবে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব লক্ষ্যবস্তু-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে স্কুলটির তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি। একই সঙ্গে ভবনটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না, তা নিশ্চিত করতেও যুক্তরাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টিকে শুধু সাধারণ অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘একটি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চরম ঝুঁকি রয়েছে জানা সত্ত্বেও এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে মার্কিন বাহিনী স্কুল ভবনে ওই হামলা চালিয়েছিল।’’
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি তদন্তের সূত্র উল্লেখ করে দাবি করেছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের কোনো বালিকা বিদ্যালয়ে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালায়নি।
তবে এর আগে রয়টার্স প্রথম প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তেই মিনাবের প্রাণঘাতী হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
পরবর্তীতে পেন্টাগন তদন্তের পরিধি বাড়ালেও এখন পর্যন্ত সেই প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মিনাবের স্কুলটি একটি চিহ্নিত বেসামরিক স্থাপনা ছিল। এটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন কোনো প্রমাণও তারা পাননি।
ল্যামার্ডের ক্রীড়া কেন্দ্রেও একই সিদ্ধান্ত
একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণ ইরানের ল্যামার্ড শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে চালানো হামলার ক্ষেত্রেও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলার কারণে আশপাশের একটি আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ২২ জন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, ল্যামার্ডের ওই হামলাটিও ছিল একটি নির্বিচার যুদ্ধাপরাধ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এর আগে গত মার্চে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, ওই দিন ল্যামার্ড শহরে মার্কিন বাহিনী কোনো হামলা চালায়নি।
সূত্র: রয়টার্স