
ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর ভবিষ্যতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কিছু অংশ মাটির নিচে নির্মাণের কথা ভাবছে দুবাই। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বহু বিলিয়ন ডলারের বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের আকার কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি ট্যাংক মাটির নিচে রাখার ভাবনা
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুবাই এয়ারপোর্টসের প্রধান নির্বাহী পল গ্রিফিথস জানিয়েছেন, নতুন বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর মধ্যে জ্বালানি সংরক্ষণের ট্যাংকগুলো মাটির নিচে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে কিছু স্থাপনার কাঠামো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নকশা পর্যায়ে রয়েছে।
গ্রিফিথস বলেন, ‘কিছু অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী করতে হতে পারে, যাতে সেগুলো আরও স্থিতিস্থাপক হয়।’
তিনি জানান, বিমানবন্দরকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বিরুদ্ধে আরও সক্ষম করে তুলতে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা বর্তমানে নকশা প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাটির নিচে জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। সম্ভাব্য হামলার ধরন, সেসব হামলার সম্ভাব্য পরিণতি এবং সামগ্রিক ঝুঁকি—সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনাগুলো করা হচ্ছে।
দুবাইয়ের নতুন বিমানবন্দরটি বছরে ২৫ কোটি যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে নির্মিত হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এই বহু বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের পরিসর কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন গ্রিফিথস।
তিনি জানান, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর দুবাই এয়ারপোর্টসের চেয়ারম্যান শেখ আহমেদ বিন সাঈদ আল মাকতুমের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, চলমান যুদ্ধের কারণে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না।
হামলার পরও দ্রুত চালু হয়েছিল বিমানবন্দর
১৯৬০ সালে যাত্রা শুরু করা দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একসময় টানা এক দশক বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থানে ছিল। কিন্তু চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হলে বিমানবন্দরটি বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সময়ে দুবাইয়ের প্রধান বিমানবন্দর ডিএক্সবির মাটির ওপর থাকা জ্বালানি ট্যাংক হামলার মুখে পড়ে। ওই ঘটনার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
তবে গ্রিফিথসের দাবি, হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই বিমানবন্দরটি আবার চালু করা সম্ভব হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো সময়জুড়েই বিমানবন্দরের কার্যক্রম নিরাপদ ছিল।
ভূগর্ভস্থ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হতো যাত্রীদের
সংঘাত শুরু হওয়ার পর দুবাইয়ের প্রধান বিমান সংস্থা এমিরেটস তাদের পুরো বহরের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য তারা আবার বিমান চলাচল শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর নজরদারিতে থাকা একটি সংকীর্ণ আকাশপথ ব্যবহার করে এসব ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।
সংঘাতের প্রথম কয়েক সপ্তাহে দুবাইয়ের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি বিমানবন্দরের আশপাশেও, ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। এসব হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে শত শত মানুষ আহত হন এবং এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হন।
গ্রিফিথস জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ থাকায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আগাম হামলার সতর্কবার্তা পেত। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যাত্রীদের ভূগর্ভস্থ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ১১১টি সতর্কবার্তার মধ্যে ১৭টি হামলায় রূপ নেয়। তবে অধিকাংশ হামলার প্রভাব ছিল খুবই সীমিত। কোনো হামলার পর বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ও সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে নিশ্চিত করলে দ্রুত বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হতো। এমনও হয়েছে, সতর্কতা জারির মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দুবাই বিমানবন্দরে যাত্রী চলাচল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। ফেব্রুয়ারিতে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছিলেন ৭৪ লাখ যাত্রী। মার্চে সেই সংখ্যা নেমে আসে ২৫ লাখে।
এরপর ধীরে ধীরে যাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকে। এপ্রিলে ৩৫ লাখ, মে মাসে ৪৫ লাখ, জুনে ৫০ লাখ এবং জুলাইয়ে ৬৩ লাখ যাত্রী দুবাই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন।
গ্রিফিথস বলেন, বর্তমানে যাত্রী সংখ্যা আবার ঊর্ধ্বমুখী। তার আশা, আগামী বছর দুবাই বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে।
তিনি বলেন, ‘মানুষের স্মৃতি এখন দ্রুতই ম্লান হয়ে যায় এবং আমরা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেছি। আগামী বছরের শুরুর দিকেই পূর্ণ পুনরুদ্ধার হবে বলে আমরা আশা করছি।’
ফিরেছে ৫০টির বেশি বিমান সংস্থা
গ্রিফিথসের তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে ৫০টির বেশি বিমান সংস্থা দুবাইয়ে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। এসব সংস্থার মধ্যে এয়ার ফ্রান্সও রয়েছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজও অক্টোবর থেকে শীতকালীন সূচি কার্যকর হলে দুবাইয়ে আবার ফ্লাইট চালু করবে।
তবে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যাত্রী পরিবহনের জন্য নতুন করে কাজে লাগানো উড়োজাহাজগুলোর সক্ষমতা পূর্ণ থাকায় কিছু বিমান সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের রুটে ফ্লাইট ফিরিয়ে আনতে সময় নিচ্ছে বলে জানান গ্রিফিথস।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ৭৮ শতাংশ যাত্রী ডিএক্সবিতে ফিরে এসেছেন। বাকি ২২ শতাংশও খুব শিগগিরই ফিরে আসবেন।’
তথ্য সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস