
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে মহাসাগরের তাপমাত্রার সর্বশেষ রেকর্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মেরু অঞ্চল বাদে বিশ্বের মহাসাগরগুলোর গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনোও এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
সোমবার (১০ জুলাই) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে ৬০ ডিগ্রি উত্তর থেকে ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল ২০২৩ সালে, তখন তা ছিল ২০ দশমিক ৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ইউরোপের পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ২ দশমিক ৭৯ ডিগ্রি বেশি। দুই মাসের হিসাবে এটিই অঞ্চলটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানির কিছু এলাকা ও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময় ধরে তাপপ্রবাহের পাশাপাশি অস্বাভাবিক শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করেছে। এর প্রভাবে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
ইউরোপের আটলান্টিক উপকূল এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরেও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। এসব অঞ্চলের অনেক জায়গায় তীব্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রের অতিরিক্ত উষ্ণতা দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এতে প্রবালপ্রাচীরের ব্যাপক বিবর্ণতা, পানির নিচের শৈবাল বন ধ্বংস এবং মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপের একটি বড় অংশ মহাসাগর শোষণ করে এবং এভাবেই জলবায়ু ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে উঠলে তা প্রসারিত হয়। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ে। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, এখন পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য এই তাপীয় প্রসারণ দায়ী।
এ ছাড়া উষ্ণ সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে বেশি তাপ ও জলীয়বাষ্প প্রবেশ করে। এর ফলে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি অতিবৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এর মধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রবণতা মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে সাময়িকভাবে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কোপার্নিকাসের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পশ্চিম ইউরোপে তীব্র তাপ ও খরার প্রবণতা একে অপরকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১৯০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক মাস পার হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, যে ধরনের আবহাওয়াকে একসময় চরম পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আবহাওয়ার অংশ হয়ে উঠতে পারে।