
মহাকাশ জয় ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বড়সড় ধাক্কা দিল পরাশক্তি চীন। স্যাটেলাইট দিকনির্ণয় ব্যবস্থা (জিপিএস), আকাশ থেকে উন্নত নজরদারি এবং কক্ষপথে প্রতিপক্ষের কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে টপকে গেছে বেইজিং। ওয়াশিংটনের একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার (২৮ জুন) হংকংভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই গবেষণার বিষয়টি সামনে আনা হয়।
মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন ফাউন্ডেশন’ (আইটিআইএফ) তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সরকারের শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার ওপর ভর করে চীন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক মহাকাশ খাত গড়ে তুলেছে। এর ফলে মহাকাশ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের যে ব্যবধান ছিল, তা এখন প্রায় মুছে যাওয়ার পথে।
গত ৮ জুন প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন যদি অনতিবিলম্বে বড় কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতির একক নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বেইজিংয়ের হাতে। আগামী এক দশকের (১০ বছর) মধ্যে এই মহাকাশ অর্থনীতির আর্থিক মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৬টি প্রধান খাতের তুলনামূলক চিত্র: কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
প্রতিবেদনে মহাকাশ প্রযুক্তির প্রধান ছয়টি খাতের একটি চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে:
পজিশনিং, নেভিগেশন ও টাইমিং: এই ক্ষেত্রে আমেরিকার জিপিএস-কে পেছনে ফেলেছে চীনের তৈরি 'বেইদু' নেভিগেশন সিস্টেম। কৃত্রিম উপগ্রহের বিশাল সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে চীন এখানে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে।
স্যাটেলাইট বিধ্বংসী (কাউন্টারস্পেস) প্রযুক্তি: কক্ষপথে শত্রুদেশের স্যাটেলাইট অকেজো বা ধ্বংস করার প্রযুক্তিতে চীন এখন বিশ্বনেতা। কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং ডাইরেক্টেড এনার্জি অস্ত্রের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কক্ষপথে মহাকাশযানের লড়াই বা ‘ডগফাইটিং’ সক্ষম স্যাটেলাইট তৈরিতেও চীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
রিমোট সেন্সিং ও স্যাটেলাইট ইমেজিং: উন্নত ছবি ও তথ্য সংগ্রহের এই ক্ষেত্রেও চীন এগিয়ে। গাওফেন ও জিলিন-১ এর মতো সরকারি ও বেসরকারি স্যাটেলাইট বহরের সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইমেজিং নেটওয়ার্ক এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে।
মহাকাশ স্টেশন: এই খাতে দুই দেশের শক্তি এখন প্রায় সমানে সমান। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বিপরীতে চীন তাদের নিজেদের 'তিয়ানগং' স্টেশনকে অতি দ্রুত সম্প্রসারিত করছে।
পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের ব্রডব্যান্ড: এই খাতে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য। ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের ‘স্টারলিংক’ এবং অ্যামাজনের ‘প্রজেক্ট কুইপার’ চীনের ‘কিয়ানফান’ ও ‘গুয়াওয়াং’ প্রকল্পের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেটের অভাব ও রকেট উৎক্ষেপণের সীমাবদ্ধতা চীনের জন্য এখানে বড় বাধা।
পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট: রকেট বারবার মহাকাশে পাঠানোর প্রযুক্তিতে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব এখনো অক্ষুণ্ণ। স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন ৯’ এর মতো সফল প্রযুক্তি চীন এখনো পুরোপুরি নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারেনি।
দুই পরাশক্তির ভিন্ন কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণার মূল শক্তি হলো নাসা (NASA) এবং বেসরকারি খাতের (বিশেষ করে স্পেসএক্স) মধ্যকার নিবিড় অংশীদারিত্ব। অন্যদিকে, চীন হাঁটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। তারা ‘হোল-অফ-সোসাইটি’ নীতি এবং সামরিক-বেসামরিক খাতের মেলবন্ধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তি ও অর্থকে একক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে।
২০১৪ সালে বেইজিং মহাকাশ খাতকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার পর থেকে দেশটিতে ল্যান্ডস্পেস, গ্যালাকটিক এনার্জি, আইস্পেসের মতো ৫০০টিরও বেশি আধুনিক মহাকাশ কোম্পানি গড়ে উঠেছে।
এই প্রতিবেদনের লেখক এলিস শেরার চীনের উৎপাদন ক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন:
‘চীনের উৎপাদন সক্ষমতা অসাধারণ। কিন্তু পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেটে পুরোপুরি সফল না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে কঠিন।’
তবে রিপোর্টের শেষ অংশে ওয়াশিংটনকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, চীন যদি মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি পেছনে ফেলে দেয়, তবে মার্কিন অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।