
একটি বেড়িবাঁধের অপসারণ ও স্থায়িত্বকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালীতে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘটা এই সহিংসতায় উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। বাঁধটি একদিকে ফসলি জমির সুরক্ষায় কাটার দাবি উঠলেও, অন্যদিকে নদীভাঙন ঠেকাতে তা বহাল রাখার অনমনীয় অবস্থানের কারণে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
গত কাল শনিবার (১৩ জুন) সন্ধ্যার দিকে দুমকি উপজেলার কার্তিকপাশা এবং সদর উপজেলার মৌকরন গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে মৌকরন বাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০০৮ সালে মৌকরন ইউনিয়নের বাজার সংলগ্ন পায়রা নদীর একটি শাখা খালের মুখে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে বাঁধটি নির্মাণের পর থেকেই মৌকরন খালসহ এর বিভিন্ন শাখা খালগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মৌকরন গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা প্রতি বছর কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনছে।
বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন দুমকি উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের কার্তিকপাশা গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, এই বেড়িবাঁধটি তৈরি হওয়ার পর থেকেই তারা পায়রা নদীর ভয়াল গ্রাস, তীব্র স্রোত, জলোচ্ছ্বাস এবং ক্রমাগত নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। ফলে নিজেদের বসতভিটা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাঁরা যেকোনো মূল্যে এই বাঁধটি বহাল রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে মৌকরন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের (হক শিকদার) ছেলে মনিরুজ্জামান কুট্টি সাংবাদিকদের বলেন:
“দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতায় কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছি। সম্প্রতি স্থানীয় প্রশাসনের পরামর্শে গ্রামবাসীর অর্থায়নে বাঁধ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শনিবার ভেকু মেশিন দিয়ে বাঁধ কাটার কাজ শুরু করলে অপরপক্ষ বাধা দেয়। একপর্যায়ে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই আকস্মিক সংঘর্ষের ঘটনায় তাদের পক্ষের রাকিব (১৮), শাহাদাত হোসেন (২৫) ও ইছা আকনসহ (৩৫) প্রায় ১০-১২ জন আহত হয়েছেন।
অন্য দিকে, বাঁধ কাটার তীব্র বিরোধিতা করে কার্তিকপাশা গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন মাহামুদ বলেন:
“বেড়িবাঁধটি নির্মাণের পর আমরা নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাচ্ছি; কিন্তু কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে বাঁধ কাটার উদ্যোগ নিয়েছেন। শনিবার বিকালে তারা ভেকু মেশিন দিয়ে বাঁধ কাটতে শুরু করলে আমরা কারণ জানতে চাই। এ সময় আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়।”
হামলার শিকার হয়ে তাদের পক্ষের স্কুলশিক্ষক সোহরাফ হোসেন (৫২), নেছার (৩০), মাসুদ প্যাদা (৪৫) ও জাকির সরদারসহ (৪৫) ৭-১০ জন আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
দুই গ্রামের মধ্যে তুমুল সংঘাতের খবর পেয়ে দুমকি থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তারা লাঠিচার্জ ও তৎপরতা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আপাতত বাঁধ কাটার সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দুমকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেলিম উদ্দীন সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
“বেড়িবাঁধ কাটাকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। বাঁধ কাটা বা না কাটার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর সিদ্ধান্ত নেবে। আহতদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”