
পবিত্র মসজিদের ভেতর ঢুকে কোরআন তিলওয়াত ও জিকিররত অবস্থায় দুই নামাজি মুসল্লিকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। খুলনার দৌলতপুর থানা এলাকায় ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন ও নৃশংস হামলার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর থেকেই হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুলিশ। অপরাধীদের ধরতে ইতিমধ্যেই শহরের বিভিন্ন সন্দেহভাজন আস্তানায় বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
আজ রোববার (১৪ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানাধীন বিএল কলেজ রোডের ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ জামে মসজিদের অভ্যন্তরে এই দুর্ধর্ষ হামলার ঘটনাটি ঘটে।
সশস্ত্র এই হামলায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ ও আহতরা হলেন— উক্ত মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তথা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লোকমান হাকিম এবং অপর মুসল্লি আলম মণ্ডল। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত এই ন্যাক্কারজনক কাণ্ডের সাথে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এদিকে আহতদের মধ্যে লোকমান হাকিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী জানান, প্রতিদিনের মতো আজ ভোরেও ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ জামে মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করছিলেন মুসল্লিরা। জামাত শেষ হওয়ার পর সেখানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির চলছিল। ঠিক এমন সময় আকস্মিকভাবে মসজিদের ভেতরে অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করে। তারা মূলত ব্যবসায়ী লোকমান হাকিমকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলি ছোড়ে। ওই সময় তাঁর পাশে থাকা আলম মণ্ডল নামের আরেক মুসল্লিও গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার পর রক্তাক্ত লোকমান হাকিম নিজের মোবাইল ফোন দিয়ে কোনোমতে পরিবারকে বিষয়টি জানালে স্বজনেরা দ্রুত মসজিদে ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সরাসরি ঢাকায় নিয়ে যান।
অন্যদিকে, গুলিবিদ্ধ অপর ব্যবসায়ী আলম মণ্ডলকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি— হামলায় লোকমান হাকিমের শরীরে তিনটি এবং আলম মণ্ডলের শরীরে একটি গুলি লেগেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুলিবিদ্ধ ব্যবসায়ী লোকমান হাকিম উত্তর কাশিপুর এলাকার মৃত জব্বার শেখের ছেলে। তিনি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ওজোপাডিকোর নিবন্ধিত ঠিকাদারি ও জ্বালানি তেলের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে একটি মামলাও দায়ের হয়েছিল। অপরদিকে আহত আলম মণ্ডল খালিশপুর এলাকার মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে এবং পেশায় একজন বস্ত্র ব্যবসায়ী।
মসজিদের একাধিক নিয়মিত মুসল্লি জানান, লোকমান হাকিম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই মসজিদে এসে জামাতের সাথে পড়তেন। বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাজের পর তিনি নিয়মিত কোরআন শরিফ পাঠ করতেন। আজ সকালের ঘটনার সময়ও তিনি কোরআন পড়ছিলেন এবং সেই অবস্থাতেই তাঁকে গুলি করা হয়। আল্লাহর ঘরের ভেতর এমন অতর্কিত হামলায় তারা সবাই চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ প্রসঙ্গে ৫৬ বছর বয়সী এক প্রবীণ মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার পুরো জীবনে মসজিদের ভেতর এমন রোমাঞ্চকর ও অপ্রীতিকর ঘটনা কখনো দেখিনি বা শুনিনি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক ঘটনা। সাধারণ মানুষসহ মুসল্লিদের ভেতর আতঙ্ক বিরাজ করছে এ ঘটনার পর।
ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ জামে মসজিদের ইমাম মো. আমান উল্লাহ ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন:
“আমি ফজরের নামাজ শেষ করে বাসায় যাওয়ার পর শুনেছি মসজিদে গুলির ঘটনা ঘটেছে। দুজন গুলিবিদ্ধ, একজন ঢাকায় একজন খুলনায় চিকিৎসারত আছেন। লোকমান হাকিম কুরআন পড়ছিল এবং আলম মণ্ডল জিকির করছিল।”
এদিকে একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, ব্যবসায়ী লোকমান হাকিমকে হত্যার উদ্দেশ্যে এর আগেও একবার ওত পেতে গুলি করার চেষ্টা করেছিল দুর্বৃত্তরা। তবে সেবার কারিগরি ত্রুটির কারণে হামলাকারীদের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি বের না হওয়ায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এ ছাড়া সম্প্রতি খুলনা থেকে বদলি হয়ে যাওয়া এক আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গেও তাঁর গভীর সখ্যতা ছিল বলে জানা গেছে। তেলের ডিপো কিংবা ওজোপাডিকোর বড় কোনো ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে কোনো পুরোনো বিরোধের জেরে এই হামলা কি না, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। ইতিমধ্যে লোকমান হাকিমের ব্যক্তিগত ফোন থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু বা ডিজিটাল তথ্য উদ্ধার করেছে পুলিশ, যা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (নর্থ) সুদর্শন কুমার রায় গণমাধ্যমকে বলেন:
“মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে মুসল্লিদের ওপর গুলির ঘটনা তদন্তে কয়েকটা টিম কাজ করছে। কিছু ডিজিটাল এভিডেন্স সংগ্রহ করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অতি দ্রুত এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আটক করে মূল ঘটনা উদঘাটন করা হবে। লোকমান হাকিম তেলের ডিপোর এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন, এছাড়া তিনি ওজোপাডিকোর ঠিকাদার ছিলেন। কোনো ব্যবসায়িক ও পারিবারিক শত্রুতা আছে কিনা এগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া তেল ব্যবসার অনেক তথ্য আমাদের কাছে এসেছে তবে তদন্তের স্বার্থে এগুলো প্রকাশ করা যাচ্ছে না।”