
আর মাত্র এক দিন পরেই পর্দা উঠছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় উৎসব ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। ঠিক এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে অন্যতম আয়োজক দেশ মেক্সিকোতে আকস্মিক এক গণবিক্ষোভের ঘটনা ফুটবলপ্রেমী ও আয়োজকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। রাজধানী মেক্সিকো সিটির রাজপথে শত শত আন্দোলনকারীর অবস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা ঘিরে বিক্ষোভ প্রদর্শন বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিশ্বব্যাপী উৎসবের আমেজে কিছুটা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ রাজধানীর ঐতিহাসিক অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামের চারপাশের সড়কগুলোতে জড়ো হয়েছেন। একপর্যায়ে তারা স্টেডিয়ামের মূল প্রবেশদ্বারের দিকে যাওয়ার রাস্তাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে অবস্থান নেন। এতে ওই পুরো এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং টুর্নামেন্টের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখন এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আয়োজকদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করেছে।
আন্দোলনকারীদের এই বিক্ষোভের পেছনে মূলত দুটি সংবেদনশীল ও বড় ইস্যু রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রথম কারণটি হলো মেক্সিকোর শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনরত শিক্ষকরা মূলত তাদের বিদ্যমান বেতন কাঠামোর আধুনিকায়ন, পেনশন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের মানোন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মূল অভিযোগ, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে সরকারের টনক নাড়াতে তারা এই আন্তর্জাতিক মঞ্চকে বেছে নিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিক্ষোভের দ্বিতীয় বড় কারণটি হলো মেক্সিকোতে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া হাজারো মানুষের সন্ধান এবং এই মানবিক সংকটে প্রশাসনের চরম উদাসীনতা নিয়ে তীব্র গণঅসন্তোষ। আন্দোলনকারীদের একাংশের স্পষ্ট অভিযোগ, বিশ্বকাপের মতো মেগা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকার দেশের মূল সামাজিক ও মানবিক সমস্যাগুলো থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন ধরে যাদের স্বজনেরা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের আক্ষেপ—ন্যায়বিচার ও সত্য উদঘাটনের জন্য তারা বারবার আকুতি জানালেও প্রশাসন সেসব বিষয়কে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিচ্ছে না।
এদিকে, রাজপথের এই উত্তাল পরিস্থিতি কিংবা বিক্ষোভের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে এখন পর্যন্ত মেক্সিকো সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশদ কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার। ওই ঐতিহাসিক ম্যাচটিকে ঘিরে যখন কোটি ফুটবলপ্রেমীর উন্মাদনা তুঙ্গে, ঠিক তখন এই আন্দোলন আয়োজক কমিটির জন্য এক বড় পরীক্ষা। অবশ্য ফিফা ও স্থানীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, এই পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং বিশ্বকাপের মূল আসর বা ম্যাচ পরিচালনায় এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এই ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছে। কেননা এবারই প্রথম তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যৌথভাবে এই বৈশ্বিক মহাযজ্ঞের সহ-আয়োজক। আর সে কারণেই খেলা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে মেক্সিকোর ভেতরের এই অশান্ত পরিবেশ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বেশ জোরেশোরেই আলোচিত হচ্ছে।
সূত্র: টিভিপি ওয়ার্ল্ড