
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের জেরে কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেও থমকে যায়নি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্য। উল্টো হরমুজ সচল থাকার সময়ের চেয়েও লোহিত সাগরের বিকল্প রুট ব্যবহার করে চলতি মাসে ইউরোপের বাজারে রেকর্ড পরিমাণ উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েল সরবরাহ করে চলেছে সৌদি আরব।
আন্তর্জাতিক শিপিং ট্র্যাকার কেপলার এবং ভরটেক্সার সর্বশেষ পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সৌদি আরব তাদের লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে ইউরোপে জ্বালানি রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে জোরদার করেছে।
কেপলারের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে সৌদির এই ইয়ানবু বন্দর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে দৈনিক ১ লাখ ১৮ হাজার ব্যারেল জেট ফুয়েল পাঠানো হয়েছে, যা বিগত ২০২৫ সালের আগস্ট মাসের পর সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, অপর ট্র্যাকার সংস্থা ভরটেক্সার হিসাব বলছে এই সরবরাহের পরিমাণ আরও বেশি—দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই রুট দিয়ে সৌদির সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানির পরিমাণ ছিল দৈনিক মাত্র ৭৭ হাজার ব্যারেল। তবে জেট ফুয়েল সরবরাহের এই সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি বা উল্লম্ফন নিয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল জায়ান্ট 'সৌদি আরামকো' আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
বিগত ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই ছিল ইউরোপের প্রধান বিমান জ্বালানি সরবরাহকারী। সে সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল জেট ফুয়েল ইউরোপে পাঠানো হতো। কেপলারের তথ্য মতে, সে বছর ভারত, নাইজেরিয়া এবং আমেরিকা থেকে আসা তেলসহ ইউরোপের মোট দৈনিক আমদানির গড় ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। বর্তমান অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব কৌশলগত কারণে ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে তাদের বিকল্প বাণিজ্য সচল রেখেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সৌদির এই বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা যদি এভাবে দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে, তবে তা হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে ইউরোপের বাজারে তৈরি হওয়া জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে জেট ফুয়েলের স্বাভাবিক প্রবাহে হরমুজ সংকটের বহুমুখী প্রভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সৌদি আরব ছাড়াও ইউরোপ মহাদেশ বর্তমানে আমেরিকা এবং নাইজেরিয়া থেকে তাদের বিমান জ্বালানির আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে, যা গত মে মাসে গড়ে দৈনিক প্রায় ২ লাখ ব্যারেলে গিয়ে পৌঁছেছিল।
এর আগে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছিল যে, হরমুজ সংকটের কারণে চলতি জুন মাসের মধ্যেই ইউরোপে উড়োজাহাজের জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। তবে ইউরোপীয় বিভিন্ন বিমান সংস্থাগুলো আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে জ্বালানি সংকটের এমন আশঙ্কাকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলে দাবি করছে।
সূত্র: রয়টার্স