
১২ বছরের অবুঝ ছেলের চোখের সামনেই ধারালো ছুরি দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সানজিদা আক্তার রেশমি নামে এক নারীকে। কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া এলাকায় নিজ বাসভবনের ভেতরেই এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এই রোমহর্ষক খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মূল অভিযুক্তসহ তিন নারীকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) রাতের প্রহরে নিজ বাসার ভেতরে এই সঙ্ঘবদ্ধ হামলার শিকার হন ওই নারী। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে গভীর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, নিহত রেশমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একটি মুদির দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতেন। সেই সুবাদেই দোকান মালিক শফিউল আলম সওদাগরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং পরবর্তীতে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শফিউল সওদাগরের সঙ্গে রেশমির এই ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জানতে পেরে তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এর জেরে গত বুধবার রাতে ইয়াসমিন আরও কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে রেশমির ভাড়া বাসায় চড়াও হন। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি ও একপর্যায়ে তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এ সময় ক্ষিপ্ত নারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সানজিদার ওপর উপর্যুপরি হামলা চালান।
রক্তাক্ত এই হামলার সময় বাসায় উপস্থিত থাকা সানজিদার ১২ বছর বয়সি ছেলে সাব্বিরের আত্মচিৎকারে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয় জনতা পালিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন নারীকে হাতেনাতে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন। একই সঙ্গে মারাত্মক জখম হওয়া সানজিদাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি মারা যান।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিহতের ছেলে সাব্বির কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, ঘটনার সময় সে ও তার মা বাসায় ছিলেন। এছাড়া আরও দুজন পুরুষ সেখানে অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে একজনকে সে শফিউল আলম সওদাগর হিসেবে চিনতে পেরেছে। পরে কয়েকজন নারী বাসায় ঢুকে তার মায়ের ওপর হামলা চালায় এবং ছুরিকাঘাত করে।
নিহতের বাসায় কাজ করা গৃহকর্মী আনোয়ারা বেগম সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, পূর্বের পারিবারিক বিরোধ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। কয়েকজন কুচক্রী মানুষের প্ররোচনাতেই এই সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর ছুটে যাওয়া প্রতিবেশী সোহাগ জানান, ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে ঘরের ভেতর থেকে কয়েকজন অভিযুক্ত নারীকে ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন।
স্থানীয় সমাজকর্মী ডালিম ও রিয়াদ জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে অবহিত করেন এবং আহত সানজিদাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। নিহতের নিকটাত্মীয়রা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় স্থানীয়রাই উদ্ধার কার্যক্রমে এগিয়ে আসেন। তবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসা নিহতের সাবেক স্বামী ইমন কন্ট্রাক্টর বলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি আগে কিছু জানতেন না। খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
লোমহর্ষক এই খুনের বিষয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আলী বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অভিযুক্ত তিন নারীকে আটক করেছে।”
হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে ওসি আরও বলেন, “স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রেশমির সঙ্গে শফিউল আলম সওদাগরের পরকীয়া সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করতেন তার স্ত্রী ইয়াসমিন। এ সন্দেহের জেরে ইয়াসমিন আরও কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে রেশমির বাসায় যান। সেখানে রেশমির সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি ও বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ইয়াসমিন ছুরিকাঘাত করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।”
থানার ওসি বলেন, আহত অবস্থায় রেশমিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে আর কার কী ভূমিকা ছিল তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি নিয়মিত মামলাসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।