
মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তি তীব্র করার অভিযোগ উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে পেন্টাগন ইসরায়েলকে তাদের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স (পাল্টা-গোয়েন্দা) হুমকি তালিকার সর্বোচ্চ স্তরে যুক্ত করেছে। শনিবার মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এই নেপথ্য উত্তেজনার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।
ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বের মাঝেই পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) এই নতুন মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এনবিসি-কে জানিয়েছেন, ডিআইএ একটি অভ্যন্তরীণ বার্তায় ইসরায়েল থেকে তৈরি হওয়া হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে “critical” বা ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে পেন্টাগন স্পষ্ট বার্তা দিল যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েল কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূলত ট্রাম্পের প্রধান মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তা এলব্রিজ এ কোলবি এবং কোলবির অন্যতম প্রধান সহকারী মাইকেল পি ডিমিনো চতুর্থ-এর ওপর ইসরায়েলি আড়িপাতার চেষ্টার বিষয়টি চিহ্নিত করেছে। উল্লেখ্য, কোলবি এর আগে ইসরায়েলের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের একটি "reset" বা নতুন করে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের এই পাল্টা-গোয়েন্দা হুমকির মাত্রা এখন আমেরিকার অন্য যেকোনো মিত্র দেশ, এমনকি কিছু শত্রুভাবাপন্ন দেশের চেয়েও উঁচুতে অবস্থান করছে। চলমান ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের এই তথ্য সংগ্রহের তৎপরতাকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা “unhinged” বা ‘লাগামহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
'উদ্বেগজনক হুমকি'
এনবিসি-কে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিআইএ-র এই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সাত পৃষ্ঠার একটি নথি এবং একটি চার্ট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসরায়েলের মানব সম্পদ ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তি (human espionage) এবং প্রযুক্তিগতভাবে তথ্য সংগ্রহের (technical collection) সক্ষমতা এখন একটি “critical level” বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। নথিতে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনার তালিকাও দেওয়া হয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান ও প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এই তৎপরতা দুই বন্ধুভাবাপন্ন দেশের মধ্যকার সাধারণ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সীমা বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
এমন এক সময়ে এই সতর্কবার্তা এলো যখন ইসরায়েল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরও গভীর সামরিক সমন্বয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেসে বর্তমানে একটি প্রস্তাবনা রয়েছে যা অস্ত্র গবেষণা, উৎপাদন এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে; যার ফলে ইসরায়েল ব্যাপকভাবে লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পেন্টাগনের এই নতুন মূল্যায়নের পর ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং ইসরায়েলের মধ্যে যৌথ যুদ্ধ পরিকল্পনার পরিধি বাড়ানোর প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, কারণ মার্কিন কর্মকর্তারা এখন ইসরায়েলি অফিসারদের সাথে তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারেন।
গত এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে, ট্রাম্প প্রশাসন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ কূটনীতির মাধ্যমে শেষ করার চেষ্টা করছে। তবে ইসরায়েল প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনকে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার জন্য চাপ দিচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে আবারও বোমাবর্ষণের তাগিদ দিচ্ছেন এবং লেবাননে হামলা কমানোর জন্য ট্রাম্পের দেওয়া পরামর্শ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের আড়িপাতার এই ঘটনা ওয়াশিংটনের একটি পুরনো ক্ষতকে নতুন করে চাঙ্গা করে তুলেছে। এর আগে ১৯৮০-র দশকে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক জোনাথন পোলার্ড ইসরায়েলের কাছে স্যুটকেস ভর্তি অতি-গোপনীয় নথি বিক্রি করার অপরাধে ৩০ বছর কারাভোগ করেছিলেন।