
সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক প্রোটোকলের দেওয়াল ভেঙে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, তাইওয়ান প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে আলোচনার সুযোগ পেলে তাইওয়ানের শীর্ষ নেতা অত্যন্ত আনন্দিত হবেন।
ট্রাম্পের ইঙ্গিত ও ওয়াশিংটনের ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি
এর আগে বুধবার (২০ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার স্পষ্ট আভাস দেন। হোয়াইট হাউস যখন তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের একটি বিশাল সামরিক অস্ত্র বিক্রির চুক্তি অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এই ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য সামনে এলো। গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক শেষ করার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তাইওয়ানের নেতার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখালেন ট্রাম্প।
কূটনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের পরিবর্তে চীনের বেইজিং সরকারকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দুই দেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান সরাসরি কথা বলেননি। চীন বরাবরই স্বশাসিত তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। ফলে এই সম্ভাব্য ফোনালাপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেইজিংকে চরম ক্ষুব্ধ করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
'মুখের ভুল' নয়, জেনেশুনেই কথা বলতে চান ট্রাম্প
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠকের পর ট্রাম্প যখন প্রথমবার লাই চিং-তে’র (উইলিয়াম লাই) নাম উল্লেখ করেছিলেন, তখন আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই এটিকে মুখের ভুল মনে করেছিলেন। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে এটি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল ছিল না। তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলব। আমি সবার সঙ্গেই কথা বলি। গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আমার চমৎকার বৈঠক হয়েছে। আমরা তাইওয়ান সমস্যাটি নিয়ে এক সঙ্গে কাজ করব।’
এদিকে বেইজিং সফর শেষ করার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তাইওয়ানের কাছে নতুন অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বড় দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও তাইওয়ানের সঙ্গে আমেরিকার কোনো আনুষ্ঠানিক দূতাবাস বা কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবুও ১৯৭৯ সালের ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ আইনের অধীনে দ্বীপটিকে নিজস্ব আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে আইনিভাবে বাধ্য রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি ও বেইজিংয়ের ক্ষোভ
আমেরিকার এই সম্ভাব্য বিশাল অস্ত্র চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাইওয়ানের বর্তমান সরকার বেশ সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। তাইওয়ানের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে যে, তাইওয়ান প্রশ্নে মার্কিন নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং ট্রাম্প চীনের কাছে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার বিষয়ে কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেননি।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু মার্কিন নীতি ও অস্ত্র ক্রয়ের বিষয়ে বলেন, ‘যেহেতু তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে, তাই আমেরিকার কাছ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র ক্রয়ের বিষয়ে আমরা সতর্কভাবে আশাবাদী।’
তাইওয়ান মূলত সম্ভাব্য চীনা সামরিক আক্রমণ প্রতিহত করতে মার্কিন রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে থাকে। এই কারণে মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানের ওপর তীব্র আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে নিজের প্রথম নির্বাচনী জয়ের পর তৎকালীন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের একটি শুভেচ্ছা ফোনালাপ গ্রহণ করেছিলেন, যা বেইজিংকে চরম ক্ষুব্ধ করেছিল।
সূত্র: আল জাজিরা