
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং এই পথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর বিশেষ কর বা টোল আরোপের বিষয়ে ওমানের সাথে গোপন আলোচনা চলছে—ইরানের পক্ষ থেকে এমন তথ্য ফাঁস হওয়ার পর ওমান সরকার এখন তীব্র ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই বিরোধপূর্ণ জলপথের দক্ষিণ তীরেই অবস্থিত ওমানের মুসান্দাম ছিটমহল, যা বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত মোট সামুদ্রিক জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক যৌথ সামরিক হামলার পর থেকে দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক এই রুটটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। এই সংকটের মাঝে ওমানের নীরবতার সুযোগ নিয়ে ইরান যেভাবে একক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে, তা রুখতে পশ্চিমা বিশ্ব এখন মাসকাটের ওপর কূটনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ওমান ও ইরানের নিজস্ব জলপথ: আব্বাস আরাগচি
শুক্রবার (১৫ মে) ভারতের একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন যে, হরমুজ প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে ওমান ও ইরানের নিজস্ব জলপথ। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই প্রণালির পুরো অংশই দুই দেশের জলসীমার ভেতরে অবস্থিত এবং এর মাঝে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক জলসীমার অস্তিত্ব নেই।
আরাগচি আরও প্রকাশ করেন যে, এই জলপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক নৌযানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ইরান ও ওমান যৌথভাবে একটি নতুন রূপরেখা বা রোডম্যাপ তৈরি করছে। তবে এই জলপথ ব্যবহারকারী বিদেশি জাহাজগুলোর কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি আদায় করা এবং জাহাজের প্রকৃত মালিকানা সংক্রান্ত গোপন ডেটা হস্তান্তরের যে পরিকল্পনা ইরান করেছে, সে বিষয়ে ওমান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ রয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবকে ‘বেআইনি’ বলছে পশ্চিমারা
আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের এই নতুন পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন পশ্চিমা কূটনীতিকেরা। তাঁদের মতে, এই রূপরেখার মাধ্যমে ইরান কোন দেশের মালিকানায় কোন জাহাজ চলছে, তা যাচাই করে নিজেদের সুবিধামতো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বা আটকে দেওয়ার একচেটিয়া ব্ল্যাকমেইল করার ক্ষমতা পেয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, সার্ভিস চার্জ পরিশোধের জন্য প্রতিটি আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালে একটি বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সরাসরি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী হবে, কারণ এই প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি বিতর্কিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) তহবিলে চলে যাবে, যা আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যের বিকল্প পরিকল্পনা ও ওমান সফর
ইরানের এই একপেশে ও আগ্রাসী পদক্ষেপের পাল্টা জবাব হিসেবে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের চিরন্তন স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব নেভিগেশন) বজায় রাখতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে একটি বিকল্প কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ আরব দেশের সমর্থনপুষ্ট এই পরিকল্পনাটি ইতোমধ্যে ওমানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই বিষয়ে জরুরি আলোচনার জন্য যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক পরিচালক লর্ড লুয়েলিনসহ বেশ কয়েকজন পদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডমিনগুয়েজ সম্প্রতি ওমানের রাজধানী মাসকাটে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। বর্তমানে উপকূলীয় দেশগুলোর এই ধরনের আন্তর্জাতিক জলপথে এককভাবে টোল বা কর আদায়ের কোনো আইনি এক্তিয়ার আছে কি না, সেটাই এখন এই প্রণালিটি পুনরায় সচল করার ক্ষেত্রে প্রধান আইনি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আনক্লস চুক্তি ও ইরানের সার্বভৌমত্বের যুক্তি
ইরান ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইনবিষয়ক সনদে (আনক্লস) স্বাক্ষর করলেও তা কখনোই তাদের দেশের সংসদে পাস বা র্যাটিফাই করেনি। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, তারা এই সনদের নিয়মাবলী মানতে আইনত বাধ্য নয় এবং এর বদলে তারা প্রথাগত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলতে চায়।
ইরান আরও মনে করে, উপকূলীয় কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা রাজনৈতিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যদি কোনো সামরিক হুমকি আসে, তবে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অধিকার (ইনোসেন্ট প্যাসেজ) সাময়িকভাবে স্থগিত করার বৈধ অধিকার তাদের রয়েছে। চলমান সংঘাতের শুরুতেই তেহরান অভিযোগ তুলেছিল যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার জন্য সেখানে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র মজুত করেছে।
পিজিএসএ গঠন ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
এই গভীর সংকটের মাঝেই গত ৫ মে ইরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)’ নামে একটি বিশেষ সরকারি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যার মাধ্যমে তারা এই রুটকে একটি লাভজনক অর্থনৈতিক মাধ্যমে পরিণত করতে চায়। পিজিএসএ-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন থেকে প্রণালিটি পার হওয়ার অনুমতি ও চলাচলের নির্দিষ্ট রুট ম্যাপ পেতে জাহাজগুলোকে ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের দপ্তরে অগ্রিম নাম নিবন্ধন করতে হবে এবং প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য আনুমানিক এক ডলার সমপরিমাণ ফি ইরানি রিয়ালে পরিশোধ করতে হবে।
তবে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে একমত যে হরমুজে কোনো ধরনের টোল আদায় বা নিষেধাজ্ঞা চাপানো যাবে না। যদিও চীনের আমদানিকৃত মোট ইরানি তেলের প্রায় ৪৫ শতাংশই এই সংকটের মধ্যেও এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা শুধু এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের দ্রুত অবসান চায় এবং এই পথটি বন্ধ হওয়ার মূল কারণ হলো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ। আইআরজিসি গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সফল আলোচনার পর তেহরান বেশ কিছু চীনা তেলের ট্যাংকারকে প্রণালি পার হওয়ার বিশেষ অনুমতি দিচ্ছে, কারণ এসব জাহাজ ইরানের নতুন নিয়মকানুন মেনে চলতে রাজি হয়েছে। তবে চীন এই জন্য কোনো ফি দিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
এর বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, যারা এই বেআইনি টোল বা ফি দেবে, তারা গভীর সমুদ্রে মার্কিন নৌবাহিনীর কারণে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে না, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও সংঘাতময় করে তুলেছে।