
এক বছর আগে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁকে দিয়েছিল ‘ফিল্ড মার্শাল’ খেতাব, আর আজ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার শত্রুতা নিরসনে তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান থেকে এখন দেশটির প্রথম ‘চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ)—আসীম মুনিরের এই উল্কাসম উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে গত এক বছরের নাটকীয় দুই আঞ্চলিক সংঘাত। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে ভারতের সাথে চার দিনের যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটে মধ্যস্থতা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ফিল্ড মার্শাল খেতাব
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের চার দিনের এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় এবং আকাশযুদ্ধের সেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আসিম মুনিরের নেতৃত্বকে পাকিস্তানের সরকার ও সামরিক বাহিনী অনন্য হিসেবে বিবেচনা করে। ১০ মে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর, ২০ মে পাকিস্তান সরকার তাঁকে বিরল সম্মাননা হিসেবে ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে উন্নীত করে। আইয়ুব খানের পর তিনিই দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় কর্মকর্তা যিনি এই পদমর্যাদা পেলেন। তবে আইয়ুব খানের মতো তিনি কেবল রাষ্ট্রপ্রধান হননি, বরং সেনাপ্রধানের দায়িত্বও সপদে বহাল রেখেছেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটে ত্রাতার ভূমিকা

ভারতের সাথে সংঘাত যখন তাঁর অভ্যন্তরীণ অবস্থান মজবুত করল, ঠিক তখনই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ তাঁর সামনে বৈশ্বিক মঞ্চের দুয়ার খুলে দিল। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নামে। এপ্রিলের ৮ তারিখ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, তার নেপথ্যে আসিম মুনিরের সরাসরি কূটনীতি ছিল মুখ্য। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে নিবিড় আলোচনা চালান।

এমনকি বুধবার এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দেন, তখন তিনি সরাসরি আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধের কথা উল্লেখ করেন। ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে লেখেন, “ইরান সরকার গুরুতরভাবে বিভক্ত—এই সত্যের ওপর ভিত্তি করে এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে আমাদের আক্রমণ স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে।”
ক্ষমতার রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ গতিপথ
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আসিম মুনিরের এই একক কর্তৃত্ব নিয়ে সমালোচনা থাকলেও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এখন তুঙ্গে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরণের সংস্কার এনে তিনি সেনাপ্রধানের পদের পাশাপাশি সিডিএফ হিসেবে একীভূত কমান্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্লেষক কামার চিমার মতে, এটি কেবল ক্ষমতার সুসংহতকরণ নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কৌশলগত পরিবর্তন।

একদিকে সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে ইরানের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্ত রাখা—এই কঠিন সমীকরণ মেলানোর মাধ্যমে আসিম মুনির বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেও এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। সংঘাতের ময়দান থেকে শান্তির আলোচনার টেবিল—দুই যুদ্ধই যেন তাঁর উত্থানের সোপান হিসেবে কাজ করেছে।