
মধ্যপ্রাচ্যে টানা চার দিনের পাল্টা আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোতে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে ইরান। অভিযান শুরুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় দুইশো কোটি ডলারের সমপরিমাণ সামরিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
সংবাদমাধ্যম ট্রিটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, শনিবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর প্রথম চার দিনেই প্রায় দুইশো কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আনার্দোলু এজেন্সি-এর সংকলিত তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব প্রকাশ করা হয়।
সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের এএন এফপিএস একশো তেইত্রিশ প্রারম্ভিক সতর্কতা রাডার ব্যবস্থায়। প্রায় এক দশমিক এক বিলিয়ন বা একশো দশ কোটি ডলার মূল্যের এই রাডারটি শনিবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতার কর্তৃপক্ষ রাডারে আঘাত ও ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এরপর রোববার কুয়েতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘ভুলবশত গুলিবর্ষণে’ তিনটি এফ পনেরই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। ছয়জন ক্রু সদস্য প্রাণে বেঁচে গেলেও বিমানগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। এসব যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপনে আনুমানিক দুইশো বিরাশি মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
শনিবার পাল্টা হামলার শুরুতেই ইরান বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে বড় ধরনের আঘাত হানে। এতে দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল এবং কয়েকটি বড় ভবন ধ্বংস হয়। উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু হওয়া স্যাটকম টার্মিনালগুলো ছিল এএন জিএসসি বাটিসংখ্যক মডেলের, যার প্রতিটির আনুমানিক মূল্য মোতায়েন ও স্থাপনা ব্যয়সহ প্রায় দুই কোটি ডলার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুয়াইস শিল্পনগরে মোতায়েন থাকা থাড অ্যান্টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার এএন টিপিওয়াই দুই রাডার উপাদান ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে সেখানে হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ধ্বংস হওয়া রাডার অংশটির আনুমানিক মূল্য পঞ্চাশ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের প্রায় এক দশমিক নয় শূন্য দুই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে।
ইরানের এই পাল্টা হামলা শুধু সামরিক সরঞ্জামেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিও সরাসরি আঘাতের মুখে পড়ে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে ইরান অন্তত সাতটি মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কুয়েতে ক্যাম্প আরিফজান, আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প বুয়েরিং, ইরাকের এরবিল ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি।
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে হামলার পর প্রকাশিত ছবিতে বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ ধসে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। ক্যাম্প আরিফজানে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের ভেতরে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ড্রোন ঘাঁটির আকাশসীমা অতিক্রম করে ভেতরে বিস্ফোরিত হয়।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস যাচাইকৃত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানায়, শনিবার ও রোববার ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামরিক স্থাপনাগুলো একাধিকবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সেখানে আগুন ও ঘন ধোঁয়া দেখা যায়। রোববার সকালের স্যাটেলাইট চিত্রে ঘাঁটির চারটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার প্রমাণ মেলে এবং সোমবার ভোর পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
রোববারের স্যাটেলাইট ছবিতে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি বড় ভবন থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। এটি আনুষ্ঠানিক মার্কিন ঘাঁটি না হলেও অঞ্চলটিতে নৌবাহিনীর অন্যতম ব্যবহৃত বন্দর হিসেবে পরিচিত।
সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি কূটনৈতিক মিশনও হামলার বাইরে থাকেনি। সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কূটনৈতিক স্থাপনায় আঘাত হানে ইরান।
সৌদি আরবের রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন আঘাত হানে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সেখানে সীমিত অগ্নিকাণ্ড ও সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা সিআইএ স্টেশনও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
কুয়েত সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। দূতাবাসের আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেলেও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। দূতাবাস ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট জেনারেলের পার্কিং এলাকায় সন্দেহভাজন একটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে আগুন লাগলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে আঘাতের চিহ্ন মিললেও বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।