
মাত্র এক মিনিটের সমন্বিত হামলা, কিন্তু প্রস্তুতি ছিল বহু বছরের। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে সাজাচ্ছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। শেষ ছয় মাসে এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ পায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি-এর প্রযুক্তিগত ও মানব গোয়েন্দা সহায়তায়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানে সমন্বিত একাধিক হামলায় মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যেই খামেনিসহ ‘শীর্ষ সাত নিরাপত্তা কর্মকর্তা’ এবং তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। একই অভিযানে আরও প্রায় ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের শাসন কাঠামো দুর্বল করার একটি কৌশলগত অধ্যায় শুরু করেছে। তবে অন্য একাংশের পর্যবেক্ষণ, নেতৃত্বের শূন্যতা অনেক সময় আরও কঠোর ও অনিশ্চিত শক্তির উত্থান ডেকে আনতে পারে।
খামেনিকে লক্ষ্য করে অভিযানের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ইরানের ভেতরে তথ্যদাতা, অপারেটিভ ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে মোসাদ। খামেনির দৈনন্দিন রুটিন, নিরাপত্তা বলয় এবং তার ঘনিষ্ঠদের গতিবিধির ওপর নিবিড় নজরদারি চালানো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সিআইএর সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স, ফোনালাপের তথ্য, অবস্থান এবং বৈঠকের সময়সূচি সংক্রান্ত উপাত্ত।
হামলার সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল খামেনির নির্দিষ্ট কম্পাউন্ডে উপস্থিতির সঠিক মুহূর্ত শনাক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য একত্রিত করে নির্ভুল লক্ষ্য স্থির করা সম্ভব হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার ইতিহাস থাকলেও এর আগে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করেনি ইসরায়েল। দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এক সাবেক প্রধান এই ঘটনাকে কৌশলগত ও অভিযানগত বড় চমক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, গুপ্তহত্যা কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতাদের হত্যা করা হলেও সংগঠনগুলো টিকে রয়েছে। এক সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা বলেছেন, মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ছিল ইসরায়েলের। যদিও পুরো অভিযান শেষ হয়েছে ৬০ সেকেন্ডে, এর পেছনে ছিল বছরের পর বছর প্রস্তুতি। আধুনিক যুদ্ধ এখন তথ্যনির্ভর, অনুপ্রবেশভিত্তিক এবং সঠিক সময় নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ওই হামলায় খামেনির মেয়ে, নাতি ও জামাইও নিহত হন। আহত অবস্থায় থাকা তার স্ত্রী খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ দুই দিন পর মারা যান।
এদিকে ৩ মার্চ ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন খামেনির ছেলে মুজতবা খামেনি। বিপ্লবী গার্ডের চাপের মুখে ইরানের অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্ট তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।