.png)
শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হলে স্নায়ুযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। হাতে সময় এক সপ্তাহেরও কম—আর আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে যাচ্ছে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর থাকা শেষ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিউ স্টার্ট।
চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হলে দীর্ঘ-পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেডের ওপর আর কোনো বিধিনিষেধ থাকবে না। এর ফলে ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভ মস্কোয় দুটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করার পর এই প্রথম এমন শূন্যতা তৈরি হবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রস্তাব দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার সময় পেতে দুই দেশ যেন আরও এক বছর বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেড সীমা বজায় রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাবে সাড়া দেননি।
এই মাসেই ট্রাম্প বলেন, ‘যদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়, তাহলে শেষই হবে’, এবং জানান যে এই চুক্তির জায়গায় আরও ভালো একটি চুক্তি হওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিকের যুক্তি, পুতিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা দরকার, যাতে দ্রুত বাড়তে থাকা তৃতীয় একটি পারমাণবিক শক্তি—চীন—এর মোকাবিলায় ওয়াশিংটন নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ করতে পারে।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি রাশিয়া ও চীন—উভয়ের সঙ্গেই ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ’ চান। তবে বেইজিংয়ের অবস্থান ভিন্ন। চীনের বক্তব্য, যেসব দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এখনো তাদের চেয়ে অনেক বড়, তাদের সঙ্গে একই কাতারে রেখে নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় বসা যুক্তিসংগত নয়।
কেন পারমাণবিক চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ
শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়গুলোতে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক সংঘাতে ‘পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের’ ঝুঁকিতে ছিল, তখন থেকেই উভয় দেশ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিকে প্রাণঘাতী ভুল বোঝাবুঝি ও ব্যয়সাপেক্ষ অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকানোর উপায় হিসেবে দেখেছে।
এই চুক্তিগুলো কেবল ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেডের সংখ্যা বেঁধে দেয় না; নিয়মিত তথ্য আদান–প্রদানের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করে। লন্ডনের আরইউএসআই থিঙ্কট্যাংকের গবেষক দারিয়া ডলজিকোভা বলেন, এটি ‘অন্য পক্ষ কোথা থেকে আসছে, তাদের উদ্বেগ ও চালিকাশক্তি কী—তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম’।
নতুন কোনো চুক্তি না থাকলে উভয় পক্ষকেই একে অপরের অস্ত্র উৎপাদন, পরীক্ষা ও মোতায়েন নিয়ে সবচেয়ে খারাপ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে সতর্ক করেন সাবেক সোভিয়েত ও রুশ অস্ত্র আলোচক নিকোলাই সোকভ। তার ভাষায়, ‘এটা এক ধরনের আত্ম-টিকিয়ে রাখা প্রক্রিয়া। আর নিয়ন্ত্রণহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা হলে পরিস্থিতি খুবই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।’
নতুন চুক্তি কেন কঠিন
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একে একে স্নায়ুযুদ্ধকালীন চুক্তির জায়গায় নতুন চুক্তি করেছে। সর্বশেষ নিউ স্টার্ট চুক্তি সই হয় ২০১০ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রুশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দিমিত্রি মেদভেদেভ-এর মধ্যে।
চুক্তি অনুযায়ী, উভয় দেশের মোতায়েনযোগ্য কৌশলগত ওয়ারহেডের সর্বোচ্চ সীমা ১ হাজার ৫৫০টি, আর স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে বহনের ব্যবস্থা সর্বোচ্চ ৭০০টি।
তবে নতুন চুক্তি এখন জটিল হয়ে উঠেছে। রাশিয়া বুরেভেস্তনিক ক্রুজ মিসাইল, অতিদ্রুতগামী ওরেশনিক এবং পোসেইডন টর্পেডোর মতো নতুন পারমাণবিক সক্ষম অস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো নিউ স্টার্টের আওতায় পড়ে না।
অন্যদিকে, ট্রাম্প মহাকাশভিত্তিক ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যা মস্কোর দৃষ্টিতে কৌশলগত ভারসাম্য বদলের উদ্যোগ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়ার চুক্তির বাইরে থেকেই চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে চীনের আনুমানিক ৬০০টি ওয়ারহেড রয়েছে; পেন্টাগন-এর ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা এক হাজার ছাড়াতে পারে।

২০২৩ সালে একটি দ্বিদলীয় মার্কিন কংগ্রেসনাল কমিশন জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক নয়, বরং দুইটি পারমাণবিক শক্তির—রাশিয়া ও চীনের—মুখোমুখি ‘অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জে’ পড়েছে।
কমিশনের সুপারিশের মধ্যে ছিল নিউ স্টার্টের আওতায় মজুত থেকে সরিয়ে রাখা কৌশলগত ওয়ারহেডগুলো পুনরায় ব্যবহারের প্রস্তুতি। এতে মিনুটম্যান থ্রি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ট্রাইডেন্ট ডি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রে আবার ওয়ারহেড বসানো এবং প্রচলিত অস্ত্র বহনে ব্যবহৃত প্রায় ৩০টি বি-৫২ বোমারু বিমানকে ফের পারমাণবিক ভূমিকায় আনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
এক সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়ারহেড আছে, ক্ষেপণাস্ত্র আছে—নতুন কিছু কিনতে হচ্ছে না।’
তবে র্যান্ড গবেষণা সংস্থার কিংস্টন রেইফ বলেন, উচ্চমাত্রার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিউ স্টার্ট সীমার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারে, আর রাশিয়া প্রায় ৮০০টি যোগ করতে পারবে। বড় ধরনের পরিবর্তনে উভয় দেশেরই অন্তত এক বছর সময় লাগবে।
পুতিনের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনে বিভক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে পুতিনের এক বছরের প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত কি না—তা নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকর্মী পল ডিন মনে করেন, এটি ‘অপ্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ভয়াবহ ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমাতে’ সহায়ক হবে।
তবে সমালোচকদের যুক্তি ভিন্ন। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ২০২৩ সালে নিউ স্টার্টের পরিদর্শন ব্যবস্থা স্থগিত করেছিল—তাই পুতিনের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখা কঠিন।
সাবেক কর্মকর্তা ফ্র্যাঙ্কলিন মিলার বলেন, রাশিয়া ও চীন—দু’পক্ষকে একসঙ্গে প্রতিরোধ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ‘পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ পথ প্রেসিডেন্ট নিজ সময় অনুযায়ী ঠিক করবেন।’
অন্যদিকে, সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, ট্রাম্প অনিশ্চিত হলেও রাশিয়া যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং নতুন হুমকির জবাব দেওয়া হবে ‘দ্রুত ও কঠোরভাবে’।