
তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারের দোকানিরা চার সপ্তাহ আগে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে দোকান বন্ধ রাখার পর এখন ইরান অনেকটাই স্তব্ধ। দেশজুড়ে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলন আপাতত শান্ত, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।
দোকানিদের বিক্ষোভ দ্রুত গণবিক্ষোভে রূপ নেওয়ায় কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নামলেও বহু বিক্ষোভকারী নিহত ও আটক হওয়ায় বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ ঘরে অবস্থান করছেন।
ইরান সরকার এখনো নিহতদের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) দাবি করেছে, চলতি সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬১৫। সরকার এই হিসাবকে অতিরঞ্জিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
উভয়পক্ষের উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও চরম উত্তেজনাপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সপ্তাহে হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকলে পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন। তবে বুধবার রাতে তিনি জানান, তেহরান থেকে আশ্বাস পাওয়ার পর অবস্থান নরম করেছেন; যেখানে বলা হয়েছে, আর হত্যাকাণ্ড বা আটক বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদিও আন্দোলন আপাতত স্তিমিত, তবে মূল সংকট অব্যাহত আছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়, তা আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক সংকটই মূল কারণ
এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এমেরিটাস অধ্যাপক হাসান হাকিমিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতার মূল কারণ গভীর অর্থনৈতিক সংকট। দশকের পর দশক ধরে চলা দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
পরিবেশগত সংকট, পানির তীব্র ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও বায়ুদূষণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দরপতনই বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।
ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বলেন, প্রায় এক মাস ধরে ইরানের অর্থনীতি কেবল ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এভাবে চলতে থাকলে এক মাসে দেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে, যার আর্থিক পরিমাণ ২০ থেকে ৯০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের প্রভাব
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও নীতিগত পরিবর্তনে ইরানের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা, পাশাপাশি ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) কিছুটা স্বস্তি দিলেও ২০১৮ সালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করলে সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বর্তমানে ইরানের তেল আয়ের বড় অংশ আটকে রয়েছে। যদিও চীন রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনছে, তা ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর মাধ্যমে সীমিতভাবে পরিবহন করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ইরান বর্তমানে স্ট্যাগফ্লেশনের মধ্যে রয়েছে—অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কম, মূল্যস্ফীতি বেশি। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৬ শতাংশ। গত আট বছরে ইরানিদের ক্রয়ক্ষমতা ৯০ শতাংশের বেশি কমেছে। খাদ্যপণ্যের দাম এক বছরে গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক ডলারের দাম দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার রিয়াল, যা জানুয়ারিতে বেড়ে ১৪ লাখ ২০ হাজার রিয়াল। এ অবস্থায় প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন বেকার।
ভবিষ্যৎ কি?
একজন তেহরানবাসী জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা এত বেশি যে মানুষ এখন রাস্তায় নামছে না। তবে ক্ষোভ এখনো রয়ে গেছে।
অধ্যাপক হাকিমিয়ান বলেন, সরকার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দিতে পারবে না। জোরপূর্বক দমন করলেও সংকট দূর হবে না। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা