
ইরানে চলমান প্রাণঘাতী বিক্ষোভ ও সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা ঘিরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ডাকা জরুরি বৈঠক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকদের তীব্র পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে দেশটির সংকট নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্র ইরানের প্রতিনিধির কাছ থেকে চলমান বিক্ষোভ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। একই সঙ্গে সভা জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা দেখা যায়। আল জাজিরা ও টিআরটি ওয়ার্ল্ড এই তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে বিক্ষোভ কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে যায়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের ‘সাহসী জনগণের’ পাশে রয়েছে এবং হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রয়োজন হলে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তাদের হাতে খোলা আছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাজের মানুষ। জাতিসংঘে আমরা যে অন্তহীন কথাবার্তা দেখি, তিনি সেরকম নন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, হত্যাকাণ্ড বন্ধে সব ধরনের অপশনই খোলা রয়েছে।’
টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের অনুরোধেই এই জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়। এর আগে কয়েক দিন ধরে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কৌশল নেন। তিনি বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে হত্যাকাণ্ডের মাত্রা কমছে এবং এই মুহূর্তে ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনও পরিকল্পনা নেই বলে তার ধারণা।
বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি হিসেবে উপস্থাপনের ইরানি অভিযোগও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন মাইক ওয়াল্টজ। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাসীর জানা উচিত, এই মুহূর্তে ইরানের শাসকগোষ্ঠী আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে দুর্বল। জনগণের শক্তির মুখে তারা ভীত, তাই এই মিথ্যা গল্প ছড়াচ্ছে। তারা নিজের জনগণকেই ভয় পাচ্ছে।’
এদিকে এই সংকটময় সময়ে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। নিরাপত্তা পরিষদে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মার্থা পোবি বলেন, এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া থেকে সব পক্ষকে বিরত থাকতে হবে, যাতে আরও প্রাণহানি ঘটে বা পরিস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়।
অন্যদিকে জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি গোলামহোসেইন দারজি বক্তব্যের শুরুতেই দুইজন সিভিল সোসাইটি ব্রিফারের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রতিনিধিত্ব করছেন। ইরানের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি কথা বলছেন ‘শোকাহত এক জাতির’ পক্ষে।
দারজি আরও অভিযোগ করেন, ‘যে যুক্তরাষ্ট্র এই বৈঠকের অনুরোধ করেছে, তার প্রতিনিধি আজ সত্য গোপন করতে মিথ্যা, তথ্য বিকৃতি ও ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তির আশ্রয় নিয়েছেন। ইরানে অস্থিরতা সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকা আড়াল করতেই এসব করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে দোকানদারদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ইরানে আন্দোলনের সূচনা হয়। ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দরপতন, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার অবনতির প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নামেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
এই বিক্ষোভে আন্দোলনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সেবা ও মোবাইল নেটওয়ার্কসহ প্রায় পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, যা এখনও কার্যকর রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।