
তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর দীর্ঘদিনের তিক্ততা ভুলে ভারত বিএনপির সঙ্গে এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে। গত ৩১ ডিসেম্বর, বেগম খালেদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে আসার সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিএনপির বর্তমান নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎ করেন। বিশ্লেষকরা এই অবস্থান পরিবর্তনকে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ঢাকা সফরে জয়শঙ্কর তারেকের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বিশেষ চিঠি হস্তান্তর করেন। বৈঠকের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে জয়শঙ্কর লিখেছেন, “ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ আমাদের অংশীদারিত্বের উন্নয়নে পথ দেখাবে।” বিশেষজ্ঞরা এটিকে নজিরবিহীন মন্তব্য হিসেবে দেখছেন, কারণ অতীতে নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে খালেদা জিয়ার বিরোধিতা করে আসছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ভারত ও বিএনপি উভয়কে কাছাকাছি আসতে বাধ্য করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসন এবং আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ায় বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেড়েছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, “তারেক রহমান নির্বাসনে থাকাকালীন অনেকটা পরিণত হয়েছেন।” অতীতের প্রেক্ষাপটে বিএনপি–ভারতের সম্পর্ক ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চরম অবনতি হয়েছিল। তখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ ছিল। তবে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোটের ছিন্ন হওয়া এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি নয়াদিল্লির কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
তারেক রহমানের বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “সম্পর্কের নতুন সূচনার জন্য অতীত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। শেখ হাসিনার আমলে সম্পর্ক ছিল কেবল একটি দল ও ব্যক্তির সঙ্গে। আমরা চাই জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হবে এবং ভারত যেন বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।”
দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মন্তব্য করেছেন, “অতীতের বোঝা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি বাস্তবতার কারণে তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। তবে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছায় স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে পাকিস্তানঘনিষ্ঠ বা ভারতবিরোধী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা। বিএনপি বলছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক যা আগে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল, এখন তা জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে’—এমন বার্তা দিচ্ছে বিএনপি।
সূত্র: আল জাজিরা