
পুরুষের প্রজননক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি টেস্টোস্টেরন হরমোন নিয়ে এক যুগান্তকারী ও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। বিগত প্রায় ৫০ বছরে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের শরীরে এই অতিপ্রয়োজনীয় হরমোনটির গড় উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে ৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। হরমোনের এই অস্বাভাবিক পতনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা মানবজাতির ভবিষ্যৎ প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ধরনের বিপৎসংকেত হিসেবে দেখছেন।
অর্ধশতকে অর্ধেকেরও বেশি পতন
গত ৭ জুলাই যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজির’ বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে এই গবেষণার বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করা হয়। সেখানে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, ১৯৭২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কালে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের গড় মাত্রা অর্ধেকেরও বেশি নিচে নেমে গেছে।
পুরুষের কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্য আনা, পেশি গঠন মজবুত করা, শারীরিক তেজ, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং সুস্থ শুক্রাণু তৈরির মতো মৌলিক শারীরবৃত্তীয় কাজগুলো মূলত এই টেস্টোস্টেরন হরমোনই নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ, মানবদেহের হরমোন গ্রন্থি বিনষ্টকারী ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন—এই হরমোন হ্রাসের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
‘এটি কোনো পরিসংখ্যানগত ভুল নয়’
গবেষণার ভয়াবহতা তুলে ধরে ইসরাইলের হিব্রু ইউনিভার্সিটি-হাডাসা ব্রাউন স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড কমিউনিটি মেডিসিনের খ্যাতনামা অধ্যাপক হাগাই লেভিন বলেন:
"গত ৫০ বছরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমেছে, অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে এই হরমোনের পতন ঘটেছে।"
হরমোন কমে যাওয়ার এই ধারাকে একটি ধারাবাহিক বিপর্যয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন:
"এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা বা পরিসংখ্যানগত ভুল নয়।"
বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে এই ক্রমাগত পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ ও মানবদেহে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার অবকাশ রয়েছে। তবে এই সতর্কবার্তাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রসঙ্গত, এই একই গবেষণা দল এর আগে পুরুষদের স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর সংখ্যা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে প্রমাণ করেছিল যে, গত চার দশকে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সেই সময়ও তাদের ওই গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ
সাম্প্রতিক এই উদ্বেগজনক চিত্র নিয়ে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চান্না জয়সেনা সতর্ক করে দিয়ে বলেন:
"টেস্টোস্টেরন নিয়ে পাওয়া সাম্প্রতিক তথ্যকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।"
তিনি পুরুষদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাসের এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরে আরও যোগ করেন:
"বিভিন্ন সময়ের গবেষণার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, পুরুষদের প্রজননস্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। তাই এখনই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।"