.jpeg)
চীনের স্কুলে চীনা ভাষা ও গণিতের পাশাপাশি ইংরেজিকেও দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুরা ইংরেজি শেখে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোতেও ভাষাটির জন্য বরাদ্দ থাকে বড় অঙ্কের নম্বর। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কয়েক সেকেন্ডেই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করে দিতে পারছে, তখন কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে এত সময় ও শ্রম দিয়ে ইংরেজি শেখানোর প্রয়োজন কতটা—এই প্রশ্ন ঘিরে চীনে নতুন করে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশটির প্রখ্যাত গণিতের অধ্যাপক তাং জিয়াফেং। ভেক্টর অ্যালজেব্রায় বিশেষজ্ঞ এই শিক্ষাবিদ মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ইংরেজিকে ‘মূল বিষয়’ হিসেবে রাখার সময় শেষ হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ইংরেজি শেখানো বন্ধ করার প্রয়োজন নেই; তবে চীনা ভাষা ও গণিতের সমান গুরুত্ব দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। ডয়চে ভেলের ৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে তাঁর এই অবস্থান তুলে ধরার পর চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
তাংয়ের আপত্তির একটি অংশ সাংস্কৃতিক, অন্যটি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ নিয়ে। তাঁর মতে, অনেক চীনা শিশু মাতৃভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠার আগেই ইংরেজি শেখার প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়ে। পরিবারগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যক্তিগত শিক্ষক ও কোচিংয়ের পেছনে। বিদ্যালয়গুলোরও প্রচুর সময় ও সম্পদ ব্যয় হয় পরীক্ষামুখী ইংরেজি শেখাতে। অথচ ভবিষ্যৎ পেশাজীবনে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই নিয়মিতভাবে এই ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। তাং ইংরেজিকে প্রয়োজনীয় একটি ‘উপকরণ’ হিসেবে দেখেন, পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুসরণের প্রতীক হিসেবে নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয়। মাধ্যমিকে প্রবেশের পরীক্ষা, নবম শ্রেণির কেন্দ্রীয় পরীক্ষা এবং উচ্চমাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় ইংরেজির গুরুত্ব চীনা ভাষা ও গণিতের প্রায় সমান। উচ্চমাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় ইংরেজিতে সর্বোচ্চ ১৫০ নম্বর রাখা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতায় ইংরেজিতে দুর্বলতা একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ব্যবস্থাই তাংয়ের আপত্তির মূল জায়গা। তাঁর মতে, একজন শিক্ষার্থী গণিত, পদার্থবিদ্যা বা অন্য কোনো বিজ্ঞান বিষয়ে অত্যন্ত মেধাবী হলেও ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে তার উচ্চশিক্ষার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। চীনে স্নাতকোত্তর পর্যায়েও ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আশঙ্কা, এতে এমন কিছু বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ পিছিয়ে পড়তে পারেন, যাঁদের মধ্যে ভবিষ্যতের শীর্ষ গবেষক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ তাংয়ের যুক্তিকে চীনের নতুন প্রজন্মের অনেকেই সমর্থন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন, যন্ত্র যদি কয়েক সেকেন্ডেই ইংরেজি থেকে চীনা কিংবা চীনা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে পারে, তাহলে পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর ভাষাটি মুখস্থ করানোর প্রয়োজন কতটা। দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের কেউ কেউ আবার পুরোপুরি ইংরেজির মর্যাদা বাতিলের বদলে এর নম্বর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। ১৫০ থেকে ১২০ নম্বরে নামিয়ে আনার মতো প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
তবে বিতর্কের অন্য পক্ষের যুক্তি আরও বড় একটি প্রশ্নের দিকে যায়—চীন কি ইংরেজির গুরুত্ব কমিয়ে নিজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেই দুর্বল করবে?
আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও উচ্চতর গবেষণার বিপুল অংশ এখনো ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। গবেষণাপত্র, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সফটওয়্যার, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে বহুজাতিক ব্যবসার বড় অংশের কার্যকর ভাষাও ইংরেজি। ফলে শুধু যন্ত্রের অনুবাদের ওপর নির্ভর করলে ভাষার সূক্ষ্মতা, ধারণাগত বোঝাপড়া এবং সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগে নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
ইংরেজিকে মূল বিষয় হিসেবে রাখার পক্ষে সরব হয়েছেন চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসের সাবেক প্রধান সম্পাদক হু শিজিনও। জাতীয়তাবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত এই ভাষ্যকারের মতে, বিদেশি ভাষায় দক্ষতা এখন একজন বিশ্বনাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। বর্তমান পৃথিবী বিশ্বায়নের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এবং চীনের ‘উন্মুক্ত থাকার’ নীতিও দেশটির মানুষের কর্মক্ষেত্র, জ্ঞান ও ব্যক্তিগত সুযোগ বাড়িয়েছে। তাই বিদেশি ভাষা শেখা এবং চীনা ঐতিহ্য রক্ষাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখা ভুল হবে বলে মনে করেন তিনি।
হু শিজিন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন তুলেছেন। শহরের সচ্ছল পরিবার চাইলে সন্তানকে ব্যক্তিগত শিক্ষক, বিদেশি কোর্স কিংবা আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি শেখাতে পারে। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীর কাছে সরকারি বিদ্যালয়ই হয়তো বিদেশি ভাষা শেখার একমাত্র সুযোগ। ইংরেজিকে মূল পাঠক্রম থেকে দুর্বল করা হলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানরাই বরং বিশ্বজগতের সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হারাতে পারে। অর্থাৎ ইংরেজির গুরুত্ব কমানো শিক্ষার চাপ কমাতে পারে, আবার একই সঙ্গে সামাজিক সুযোগের ব্যবধানও বাড়াতে পারে।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবশ্য ইতিমধ্যে ভাষাশিক্ষাকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। শুধু ইংরেজি, জার্মান কিংবা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় ডিগ্রি নেওয়ার বদলে ভাষার সঙ্গে আরেকটি পেশাগত দক্ষতা যুক্ত করার প্রবণতা বাড়ছে। বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির নতুন পাঠক্রমে যেমন ‘বিদেশি ভাষা প্লাস মূল বিষয়’ মডেল নেওয়া হয়েছে—ইংরেজির সঙ্গে আইন, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা অর্থনীতি পড়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। এতে ভাষাটি নিজে আর চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং অন্য একটি পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠছে।
এই বিতর্ক অবশ্য চীনের জন্য একেবারে নতুন নয়। উনিশ শতকের শেষ দিকেও দেশটিতে প্রশ্ন উঠেছিল—পশ্চিমের কাছ থেকে কতটা শেখা উচিত এবং বিদেশি জ্ঞান গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় কতটা ধরে রাখা সম্ভব। সে সময় চীনা চিন্তাবিদদের একটি অংশের যুক্তি ছিল, বাইরের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান ও প্রযুক্তি শিখতে হলে প্রথমে তাদের ভাষা ও জ্ঞানের ভাণ্ডারে প্রবেশ করতে হবে। দেড় শতাব্দী পর সেই পুরোনো প্রশ্নই যেন নতুন পোশাকে ফিরে এসেছে। শুধু এবার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
চীন এখন ব্যাটারি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবসদৃশ রোবটের মতো ক্ষেত্রে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অনেক দেশই উল্টো চীনের কাছ থেকে শিখছে। ফলে দেশটির একটি অংশ মনে করছে, পশ্চিমা ভাষাকে আগের মতো অতিরিক্ত মর্যাদা দেওয়ার প্রয়োজন আর নেই। অন্য অংশের সতর্কতা—অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি বাড়ার অর্থ এই নয় যে বাইরের বিশ্বের ভাষা ও জ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায়।
ফলে চীনের বিতর্কটি শেষ পর্যন্ত শুধু ইংরেজি পড়ানো হবে কি না—সেই প্রশ্নে আটকে নেই। এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় একটি দ্বন্দ্ব: নতুন আত্মবিশ্বাসী চীন কতটা নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সামনে আনবে, আর বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে বিদেশি ভাষার দরজা কতটা খোলা রাখবে।