
সমসাময়িক বিশ্ব চিত্রকলার কিংবদন্তি পুরুষ এবং পপ আর্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ডেভিড হকনি আর নেই। ৮৮ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কালজয়ী ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী। আজ শুক্রবার তাঁর প্রচারক এরিকা বোল্টন মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে জানান যে, ৮৯তম জন্মদিনের মাত্র এক মাস বাকি থাকতেই অনন্তকালের সফরে পাড়ি জমালেন এই মহান শিল্পী।
১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডে জন্মগ্রহণ করা ডেভিড হকনি শৈশব থেকেই ছিলেন চিত্রশিল্পের প্রতি ভীষণ অনুরাগী। ব্র্যাডফোর্ড স্কুল অব আর্ট এবং পরবর্তীতে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্ট থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি নিজেকে বৈশ্বিক শিল্পাঙ্গনে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর এই মহাপ্রয়াণের সংবাদে গোটা বিশ্বের শিল্পপ্রেমীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোক প্রকাশ করে বিশিষ্ট শিল্প ইতিহাসবিদ রিচার্ড মরিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “জটিল বিষয়বস্তুকে সহজভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলায় হকনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ব্রিটিশ শিল্পকলা আজ এক মহীরুহকে হারাল।”
বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা পপ আর্ট আন্দোলনের মাধ্যমে রাজকীয় পরিচিতি পাওয়া ডেভিড হকনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্যানভাস, তুলি আর রঙের দুনিয়ায় সমানে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৮ সালে নিউইয়র্কের এক নিলামে তাঁর আঁকা সুবিখ্যাত মাস্টারপিস ‘পোর্ট্রেট অব অ্যান আর্টিস্ট’ রেকর্ড ৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। এটি ছিল সেই সময়কার ইতিহাসে জীবিত কোনো চিত্রশিল্পীর তৈরি কর্মের সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রির এক অনন্য কীর্তি। নিজের সৃজনশীলতা ও জীবনদর্শন নিয়ে গত অক্টোবর মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পপ তারকা শিল্পী বলেছিলেন, “আমি যখন ছবি আঁকি, তখনই সবচেয়ে বেশি সুখী থাকি। অন্যরা আমার কাজ নিয়ে কী ভাবল, তা আমি পরোয়া করি না; আমি নিজে কী অনুভব করছি, সেটাই আমার কাছে আসল।”
শিল্পকলার আঙিনায় অসামান্য ও যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘কম্প্যানিয়ন অব অনার’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা লাভ করেন। ডেভিড হকনির অনন্য সৃষ্টিশৈলী সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ফ্রান্সের বিখ্যাত পম্পিদো সেন্টার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, ডেভিড হকনি যে শিল্পসম্ভার রেখে গেছেন, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ‘উজ্জ্বল, জীবন্ত এবং চিরন্তন’ হয়ে থাকবে।
লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল কলেজ অব আর্ট— যেখান থেকে তিনি একসময় স্বর্ণপদক লাভ করে নিজের স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন— এই মহানুভবের প্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হকনি আজীবন শিল্পকলার আঙিনায় এক ‘অবিসংবাদিত কণ্ঠ’ হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ক্যানভাসের এই রাজকুমারের চিরবিদায় বিশ্ব সংস্কৃতির ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি।